বরফের দেশের টিউলিপ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে তেঁতুলিয়ায়

সালাউদ্দিন কবির দোয়েল পঞ্চগড়

বরফের দেশের ফুল হিসেবে সুপরিচিত টিউলিপ। সেই টিউলিপ ফুল বাংলাদেশের মাটিতেও তার সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। শীতপ্রধান দেশ নেদারল্যান্ডস থেকে আনা চারা

2026-01-19T05:06:52+00:00
2026-01-19T05:06:52+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বরফের দেশের টিউলিপ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে তেঁতুলিয়ায়
সালাউদ্দিন কবির দোয়েল পঞ্চগড়
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:০৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
বরফের দেশের ফুল হিসেবে সুপরিচিত টিউলিপ। সেই টিউলিপ ফুল বাংলাদেশের মাটিতেও তার সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। শীতপ্রধান দেশ নেদারল্যান্ডস থেকে আনা চারা থেকে ফোটা টিউলিপ ফুল তেঁতুলিয়ার পর্যটন শিল্পে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে। চমৎকার এই ফুল দেখতে ভিড় করছেন বহু দর্শনার্থী। 

তীব্র শীত আর উপযোগী আবহাওয়ার কারণে তেঁতুলিয়ার সীমান্তঘেঁষা দর্জিপাড়ায় চাষ হচ্ছে উচ্চমূল্যের এই বিদেশি ফুল। টিউলিপ মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফুল হওয়ায় বাংলাদেশের উষ্ণ জলবায়ুতে এর চাষ করা বেশ কঠিন ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ পরিচর্যা এবং নেদারল্যান্ডস থেকে আনা চারার মাধ্যমে বাংলাদেশেও এর সফল চাষ হচ্ছে। 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে গত কয়েক বছর ধরেই ৬ থেকে ১৩ ডিগ্রি তাপমাত্রার এই জনপদে চাষ হচ্ছে টিউলিপ ফুলের। তেঁতুলিয়ার মাটিতে টিউলিপের আবাদ পর্যটন শিল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সীমান্তের কোলঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রামে টিউলিপের বাগান দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা। তাদের কারও কারও ভাষ্য তারা যেন তেঁতুলিয়ার মাটিতে একখণ্ড ইউরোপ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তেঁতুলিয়া উপজেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের মাধ্যমে খামার পর্যায়ে টিউলিপের চাষ করা হচ্ছে। চমৎকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। প্রকল্পটিতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। 

পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে টিউলিপ বাগান। স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন অনেক নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা। শীতপ্রধান দেশের টিউলিপ ফুল চাষের ক্ষেত্রে দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনশীল ধরা হয়। সাধারণত রোপণের ২০ দিনের মধ্যেই কলি আসতে শুরু করে। ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত ফুল স্থায়ী হয়। বিদেশি এই ফুলের বাজারদরও বেশ ভালো। ছোট আকারের এক ঝুড়ি (৭-৮টি) টিউলিপ ফুলের দাম সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। 

বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে তেঁতুলিয়া। এখানে উত্তরের হিমেল হাওয়া যখন হাড়কাঁপানো শিহরণ জাগিয়ে যায় তখন মনে হয় এ যেন চেনা বাংলাদেশের বাইরের কোনো এক অচেনা ভূখণ্ড। শীত এলেই কুয়াশার চাদরে মোড়া ভোর, ঘাসের ডগায় মুক্তার মতো জমে থাকা শুভ্র শিশির আর দিগন্ত জোড়া চা বাগানের ওপর বরফ-শীতল বাতাসের খেলা চলে এখানে। তেঁতুলিয়ায় শীত কেবল একটি ঋতু নয়, এ এক গভীর অনুভূতি। এখানে ভোরের আলো ফোটে দেরিতে। আর যখন ফোটে তখনও সূর্যের উত্তাপ ম্লান হয়ে থাকে হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের কাছে। 

স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকরাও বলে থাকেন, উত্তর জনপদের এই নিস্তব্ধতা আর তীব্র শীতলতা অনেকটা ইউরোপের তুষারশুভ্র আবহ তৈরি করে। ভারত ও নেপালের হিমালয়সংলগ্ন হওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা থাকে দেশের অন্য সব জেলার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি তেতুঁলিয়ায় তাপমাত্রা নেমেছিল মাত্র ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ছিল দেশের ৩০ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। 

হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা শৈত্যপ্রবাহ অঞ্চলকে এক অনন্য শীত-অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। শীতের তেঁতুলিয়া মানেই নীল আকাশে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি। তেঁতুলিয়ার আকাশ যখন মেঘমুক্ত হয় তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। বরফে ঢাকা চূড়ার ওপর সূর্যের সোনালি আভা যখন পড়ে তখন সৃষ্টি হয় এক নয়োনাভিরাম ক্যানভাস। 

প্রকৃতির এই রূপময় সৌন্দর্যের উল্টো পিঠেই রয়েছে তেঁতুলিয়ার মানুষের কঠিন জীবন সংগ্রাম। হিমালয়ের তীব্র শীত সবচেয়ে বেশি ভোগায় এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের। যখন তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছায় তখনও পেটের তাগিদে পাথর শ্রমিক, চা শ্রমিক আর ভ্যানচালকদের বের হতে হয় হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপক্ষো করে।

 সামান্য খড়কুটা জ্বালিয়ে উষ্ণতা খুঁজে নেওয়া মানুষগুলোর কাছে শীত একই সঙ্গে আনন্দ ও কষ্টের। তবে এই প্রতিকূলতা জয় করেই এখানকার মানুষ বুক বাঁধে নতুন স্বপ্নে। শীতের হাড়কাঁপানো আমেজেই ঘরে ঘরে চলে নবান্নের উৎসব। সোনালি ধান মাড়ানো, কিষানিদের পিঠাপুলির সুবাস আর কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে ভাপা পিঠার আড্ডা সব মিলিয়ে এক চিরায়ত বাংলার রূপ ফুটে ওঠে এখানে। অতিথি আপ্যায়নের লোকজ সংস্কৃতি এখানকার মানুষের জীবনকে করেছে আরও মায়াবী।

শহরের যান্ত্রিকতা আর কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে যারা প্রকৃতির আসল রূপ খুঁজতে চান তাদের জন্য পছন্দের গন্তব্য তেঁতুলিয়া। কুয়াশাচ্ছন্ন চা বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলা, বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্টে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশী তিন দেশের সীমান্ত দেখা আর সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়ায় গরম চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি পেতে অনেকেই ছুটে আসেন এখানে।

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   বরফ  সৌন্দর্য  তেঁতুলিয়ায় 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: