কেনাকাটা : প্রয়োজন নাকি অভ্যাস

নিবেদিতা দাস

‘ডিসকাউন্ট’, ‘অফার’, ‘লিমিটেড ডিল’— এই শব্দগুলো শুধু বিজ্ঞাপন নয়, মানুষের মনের দুর্বল জায়গায় আঘাত করার এক সূক্ষ্ম কৌশল।শপিংমলে গেলে বা

2026-01-20T05:43:54+00:00
2026-01-20T05:43:54+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
কেনাকাটা : প্রয়োজন নাকি অভ্যাস
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৪৩ এএম   (ভিজিট : ১৫১)
প্রতীকী ছবি
‘ডিসকাউন্ট’, ‘অফার’, ‘লিমিটেড ডিল’— এই শব্দগুলো শুধু বিজ্ঞাপন নয়, মানুষের মনের দুর্বল জায়গায় আঘাত করার এক সূক্ষ্ম কৌশল। 

শপিংমলে গেলে বা অনলাইন অ্যাপ খুললেই যেন সবাই একসঙ্গে ডাকতে শুরু করে ‘এই যে, আমাকে নাও!’, ‘ডিসকাউন্ট চলছে!’, ‘আজই শেষ!’। দরকার আছে কি না সেটি তখন দ্বিতীয় প্রশ্ন। মনে হয়, না কিনলে বুঝি মনটাই খারাপ হয়ে যাবে! 

তাই কেনাকাটা অনেকের কাছে বাজার করার কাজ নয়, বরং মন ভালো করার ফর্মুলা। মন খারাপ? শপিং। কাজের চাপ? শপিং। নিজেকে পুরস্কার দিতে চাইলে? শপিং! কিন্তু ভালো থাকার এই শর্টকাট পথ কি শেষমেশ আমাদের জীবনে আনন্দ যোগ করছে, নাকি বিল আর হিসাবের খাতায় জমিয়ে দিচ্ছে বাড়তি চাপ?

কেন বদলাল কেনাকাটার ধরন
একসময় কেনাকাটা মানেই ছিল নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ। পোশাক কেনা হতো উৎসব কিংবা প্রয়োজনের সময়, জুতা বদলানো হতো পুরোনোটি নষ্ট হলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের কেনাকাটার ধরন বদলে দিয়েছে। ফ্যাশন ট্রেন্ড দ্রুত বদলাচ্ছে, প্রযুক্তিপণ্য আসছে কয়েক মাস পরপর নতুন সংস্করণে। ফলে ‘পুরোনোটা আছে’— এই যুক্তি অনেকের কাছেই আর গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

শিক্ষক তাসলিমা শাহপারের মতে, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় মানুষের চাহিদা আর প্রয়োজনের সীমারেখা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমরা যা দেখি, সেটিকেই প্রয়োজন ভেবে নিতে শুরু করি।

বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনের বড় কারণ। অন্যের জীবনযাপন, সাজসজ্জা কিংবা ব্র্যান্ড ব্যবহারের ছবি দেখার মাধ্যমে নিজের চাহিদাও অজান্তেই বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এখন ‘ব্র্যান্ডেড পণ্য’ ব্যবহারকে সামাজিক মর্যাদার সূচক হিসেবে মাপার প্রবণতা বেড়েছে।

অনলাইন কেনাকাটা : সুবিধা নাকি ফাঁদ?
অনলাইন কেনাকাটা নিঃসন্দেহে সময় বাঁচায় ও জীবনকে সহজ করে। ঘরে বসেই পছন্দের পণ্য, ক্যাশ অন ডেলিভারি, সহজ রিটার্ন— সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে কিছু নতুন ঝুঁকি। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনা, মানহীন পণ্য হাতে পাওয়া, প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা মাসের শেষে হিসাব মেলাতে না পারার চাপ— এসব এখন অনেকের পরিচিত অভিজ্ঞতা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, অনলাইন শপিং থেকে পাওয়া তাৎক্ষণিক আনন্দ অনেক সময় মানসিক শূন্যতা ঢাকতে ব্যবহৃত হয়। একাকিত্ব, চাপ বা হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি পেতেই অনেক মানুষ এর দিকে ঝোঁকেন।

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা দীর্ঘদিন সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা পরিবার থেকে দূরত্বে থাকেন। বিশেষ করে এ ধরনের সামাজিক দূরত্বে থাকা মানুষগুলো ‘কমফোর্ট শপিং’ বা মানসিক স্বস্তির জন্য কেনাকাটা করে থাকেন। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপ বাড়ায়।

ডিসকাউন্টের মনস্তত্ত্ব
‘এখন না কিনলে মিস’— এ ভয়ই ডিসকাউন্ট সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী মন্ত্র। সীমিত সময়ের ছাড়, কাউন্টডাউন টাইমার কিংবা স্টক সীমিত— এই বিষয়গুলো আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে যুক্তির বদলে আবেগ কাজ করে বেশি।

গৃহিণী জিন্নাতুন্নেসা বলেন, কোনো জিনিসের ওপর ছাড় দেখলে মনে হয় এটি নিয়ে ফেলি। যদি পরে দাম বেড়ে যায়। এখন কাজে না লাগলেও পরবর্তীতে কাজে দেবে। বাস্তবিক ব্যাপারটা ঠিক উল্টো ঘটে। দেখা যায় যেটি নিলাম তেমন কোনো কাজে লাগছে না।

আমরা অনেক সময় ছাড়ের লোভে এমন জিনিসও কিনে ফেলি, যা আদৌ দরকার নেই। পরে সেই পণ্য পড়ে থাকে আলমারিতে, আর অপরাধবোধ জমা হয় মনে। বিশেষ করে শহুরে পরিবারে যেখানে প্রতিটি জিনিসের দাম এবং মানসিক প্রভাবের হিসাব রাখা জরুরি সেখানে এই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কেনার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা জরুরি, ‘এই জিনিসটা না কিনলে আমার কী ধরনের সমস্যা হবে?’ এই একটি প্রশ্ন যদি অভ্য াসে পরিণত করা যায়, অনেক অযাচিত কেনাকাটাকে প্রতিহত করা সম্ভব।

সচেতন কেনাকাটার ধারণা
এখন ধীরে ধীরে শহরে জনপ্রিয় হচ্ছে সচেতন কেনাকাটা। এর অর্থ কম কেনা, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী পণ্য বেছে নেওয়া। সচেতন কেনাকাটায় কিছু ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে— 

যেমন :
কেনার আগে তালিকা তৈরি
মান ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া
স্থানীয় ও টেকসই পণ্য বেছে নেওয়া
একবার ব্যবহারযোগ্য বা অতিরিক্ত প্যাকেজিং এড়িয়ে চলা
একবার ব্যবহারযোগ্য বোতলের বদলে রিফিলযোগ্য পানির বোতল বেছে নেওয়া
প্লাস্টিক কনটেইনারের পরিবর্তে কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা

এই অভ্যাসগুলো শুধু খরচ কমায় না, বরং পরিবেশের ওপর চাপও কমায়।

ব্যাংক কর্মকর্তা শিল্পী চৌধুরী বলেন, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি আর্থিক অবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করে। আমার বড় মেয়ে প্রায় এ কাজটি করে থাকে। যার কাছে যা দেখে ওর তাই প্রয়োজন। এত বোঝানোর পরও হয় না। ঘর ভরতি করে ফেলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে। সচেতন কেনাকাটা মানে নিজের পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা ভাবা।

মানসিক শান্তি ও কেনাকাটা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রয়োজনভিত্তিক কেনাকাটা দীর্ঘমেয়াদে বেশি সন্তুষ্টি দেয়। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা সাময়িক আনন্দ দিলেও পরে অনুশোচনা তৈরি করে। নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রয়োজন বুঝে কেনাকাটাই পারে জীবনে ভারসাম্য আনতে। অন্যদিকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনাকাটা মানসিক চাপ বাড়ায়— ঋণের ভয়, সঞ্চয় কমে যাওয়ার দুশ্চিন্তা কিংবা আত্মগ্লানির অনুভূতি 

তৈরি হয়। তাই সচেতন কেনাকাটা শুধু অর্থ সংরক্ষণ নয়, মানসিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নওশিন জিন্নাত বলেন, সময়ের সঙ্গে চলতে গেলে নিত্যনতুন ট্রেন্ডের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। বন্ধুরা যখন নতুন কিছু কেনে বা ব্যবহার করে তখন নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে সেটি কেনার তাড়না শুরু হয়ে যায়। এতে করে মাঝেমধ্যে অনেক বেশি কেনাকাটা করা হয়ে যায়।

আরেক শিক্ষার্থী অর্পিতা মেহেজাবিন বলেন, প্রতিদিন একই জামা পড়ে ক্লাস করতে যেতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, প্রতিদিন নিত্যনতুন জামা পড়ে। সে জন্যই অনেক বেশি কেনাকাটা করা হয়ে যায়। সেই সঙ্গে আছে বিভিন্ন পেজে আপডেট ড্রেসের ছবি। এগুলো দেখলেই মনটা অস্থির হয়ে যায় কীভাবে এটি কিনব।কেনাকাটা জীবনের অংশ, কিন্তু সেটিই যদি জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে তা হলে সমস্যা। 

শহুরে জীবনে যেখানে দ্রুতগতির জীবনধারা, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন ট্রেন্ড এবং সামাজিক প্রভাব প্রতিনিয়ত আমাদের প্রভাবিত করে, সেখানে প্রয়োজন এবং ভোগের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সচেতন সিদ্ধান্তই পারে কেনাকাটাকে ভোগ নয়, প্রয়োজনের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে।

কম কেনাকাটা মানে ক্ষতি নয়। বরং এটি হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন প্রশ্ন হলো— আমরা কি জিনিস কিনছি, নাকি জিনিসই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

এফআর


  বিষয়:   কেনাকাটা  প্রয়োজন  নাকি  অভ্যাস 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: