চরের ভোটে অগ্রাধিকার নদী রক্ষা আর সেতু নির্মাণ

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

ভোটের সময় এলেই আলোচনায় আসে উন্নয়ন। তবে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়ন মানে কোনো স্লোগান নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন।

2026-01-20T06:17:46+00:00
2026-01-20T06:17:46+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
চরের ভোটে অগ্রাধিকার নদী রক্ষা আর সেতু নির্মাণ
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৭ এএম 
গাইবান্ধার চরাঞ্চলে ভোটের রায় নির্ভর করছে বিজ্ঞানসম্মত নদী খনন, ভাঙনরোধ আর ব্রহ্মপুত্র নদে ব্রিজ কিংবা টানেল নির্মাণের ওপর। ছবি : সময়ের আলো
ভোটের সময় এলেই আলোচনায় আসে উন্নয়ন। তবে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়ন মানে কোনো স্লোগান নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অন্তত ১৬৫টি চর ও দ্বীপ চরে বসবাসকারী মানুষের ভোট ভাবনায় এবার স্পষ্ট তিনটি দাবি— চরকেন্দ্রিক কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা, বিজ্ঞানসম্মত নদী খনন, ভাঙনরোধ আর ব্রহ্মপুত্র নদে স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে ব্রিজ কিংবা টানেল। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এসব চরাঞ্চলে এখন প্রার্থীদের যাতায়াত বেড়েছে। সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি 

থাকলেও চরবাসীর প্রশ্ন খুব বাস্তব— কে তাদের জীবনের মৌলিক সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান দেবে?

উর্বর চর অথচ শিল্পহীন বাস্তবতা : চরের মাটি উর্বর, প্রতি বছর বন্যার সঙ্গে আসা পলি নতুন প্রাণ দেয় জমিকে। এই চরে এখন ব্যাপকভাবে উৎপাদন হচ্ছে ধান, ভুট্টা, গম, ডাল, তিল, বাদাম ও বিভিন্ন শাকসবজি। অনেক চরাঞ্চল ভুট্টা উৎপাদনের বড় জোগানদাতা। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের হাতে আসছে না ন্যায্য আয়। কারণ একটাই— প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের কোনো শিল্প কাঠামো নেই। ফসল ঘরে তুলেই কৃষকদের নির্ভর করতে হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর। ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেক সময় লোকসানেই ফসল বিক্রি করতে হয়। 

ফুলছড়ির চর রসুলপুরের কৃষক মো. রেজা বলেন, আমরা ফসল ফলাই ঠিকই। কিন্তু মিল নেই, কারখানা নেই। ধান বা ভুট্টা রাখার জায়গা না থাকায় কম দামে বেচে দিতে হয়। চরবাসীর দাবি, চরকেন্দ্রিক ছোট ও মাঝারি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং তরুণদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে।

নদীই জীবন, নদীই সর্বনাশ : চরের মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনার ভাঙনে প্রতি বছরই গাইবান্ধার চরাঞ্চলে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও স্কুল-মাদরাসা। কেউ আজ যে চরে বাস করছে, আগামী বছর সেখানে থাকবে এ নিশ্চয়তা নেই। ভাঙন ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে জিও ব্যাগ এবং জিও টিউবের মতো সাময়িক উদ্যোগ। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। বরং ভাঙন এক এলাকা থেকে সরে গিয়ে অন্য এলাকায় আঘাত হানছে। 

ব্রহ্মপুত্রের চরগ্রাম রসুলপুরের বাসিন্দা মো. বাবু মিয়া বলেন, নদীকে বেঁধে রাখা যাবে না। নদীকে বুঝতে হবে। খনন না করলে ভাঙন থামবে না।

চরাঞ্চলের জীবন মানেই অনিশ্চয়তা : তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত জেলা গাইবান্ধার অন্তত ৩৫ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে নদী ও চরাঞ্চল। জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বসবাস সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর ও দ্বীপ চরে। এদের প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। 

বন্যা, নদীভাঙন, শৈত্যপ্রবাহ আর খরার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকে চরবাসী। এখানে জীবন চলে কেবল জীবনের প্রয়োজনে। এখানে নদী যেমন ভরসা, তেমনি সবচেয়ে বড় ভয়ও।

নদীর ওপর নির্ভরশীল জীবন : ব্রহ্মপুত্র নদ চরাঞ্চলের মানুষের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি বড় বাধা। ফুলছড়ির বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ এ নৌপথই উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। কিন্তু নাব্য সংকট দেখা দিলেই নৌ-চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক সময় মানুষকে পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হয়। শিক্ষার্থী, রোগী ও বয়স্কদের জন্য এই যাতায়াত হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। 

সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে নৌকার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনা নতুন নয়। এ কারণে চরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, ব্রহ্মপুত্রে স্থায়ী সেতু কিংবা নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণের। 

তাদের মতে, একটি বহুমুখী সেতু বা টানেল শুধু যোগাযোগই নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি আনবে। 

ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা বাস্তবায়ন :
নির্বাচনি প্রচারে প্রার্থীরা চরাঞ্চলের উন্নয়নের কথা বলছেন। কেউ বলছেন শিল্প গড়ার কথা, কেউ নদী রক্ষার, কেউ যোগাযোগব্যবস্থার। কিন্তু চরবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন শেষে এসব প্রতিশ্রুতি অনেক সময় নদীর স্রোতের মতোই মিলিয়ে যায়। 

গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার চরাঞ্চলের মানুষ এবার আর শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিকল্পনা চান। তাদের প্রশ্ন, কবে চর হবে উন্নয়নের কেন্দ্র, কবে নদী হবে জীবন রক্ষক আর কবে ব্রহ্মপুত্র আর বাধা হয়ে থাকবে না। এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষের ভোটের রায়।

এফআর


  বিষয়:   গাইবান্ধা  চরের ভোট  অগ্রাধিকার  নদী রক্ষা  সেতু নির্মাণ 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: