সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি শহর দাভোসে শুরু হয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, মন্ত্রী, বড় ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করাই এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) শুরু হওয়া এই সভা চলবে আগামী ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দাভোস কনফারেন্স সেন্টারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কী?
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত। ১৯৭১ সালে প্রথমবার দাভোসে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। শুরুতে এটি ছিল মূলত ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফোরামের পরিধি বেড়েছে এবং এখন এটি বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে।
কোথায় হচ্ছে সম্মেলন?
এবছরের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের গ্রাউবুন্ডেন ক্যান্টনের দাভোস শহরে। প্রায় ১,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরটি একটি বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট এবং এখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। ১৯৭১ সাল থেকে প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে এখানেই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
কারা অংশ নিচ্ছেন?
এবারের সম্মেলনে প্রায় তিন হাজার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান উপস্থিত রয়েছেন। তারা বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং চলমান সংকট নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং নীতিনির্ধারকরাও এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, শুল্কনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির সিইও ও চেয়ারম্যানরাও দাভোসে উপস্থিত রয়েছেন। এসব কর্পোরেট নেতা ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করছেন।
এছাড়াও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। তারা বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করছেন।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হি লিফেং ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানিও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও শীর্ষ উপদেষ্টারাও দাভোসে উপস্থিত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প গাজা পরিস্থিতি নিয়ে একটি আলাদা বৈঠকও করতে পারেন।
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও এবারের সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং, মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলা এবং গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান ডেমিস হাসাবিস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। তারা বলছেন, এআই ভবিষ্যতে কাজের ধরন ও ব্যবসার কাঠামো বদলে দিতে পারে।
কারা আসেননি?
তবে সবাই এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে বিক্ষোভ দমন ও বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর কারণে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবছর দাভোসে আসেননি। আয়োজকরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কারণে ইরান সরকারের প্রতিনিধিত্ব এই সম্মেলনে উপযুক্ত নয় বলে মনে করা হয়েছে।
এছাড়া ভয়াবহ বন্যার কারণে মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চ্যাপো তার দাভোস সফর বাতিল করেছেন। তিনি বলেছেন, এই মুহূর্তে দেশের মানুষের জীবন রক্ষা করাই তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
কেন এবছর দাভোস গুরুত্বপূর্ণ?
এবছরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সংলাপের চেতনা’। এই প্রতিপাদ্যের আওতায় ২০০টিরও বেশি অধিবেশনে ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং নতুন সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে অনেক মানুষের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবছরের দাভোস সম্মেলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ইউরোপের সঙ্গে মতবিরোধ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সম্মেলনের আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে প্রতি বছরের মতো এবছরও দাভোস সম্মেলন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এখানে বড় বড় আলোচনা হলেও বাস্তবে সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ খুব কম দেখা যায়। তারপরও বিশ্বনেতাদের এক জায়গায় বসিয়ে সংলাপের সুযোগ তৈরি করাই এই সম্মেলনের বড় অর্জন বলে মনে করছেন অনেকে।
/ইউএমএইচ