দেশ স্বাধীনের পর পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী যখন হাতের মুঠোয়, তখন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দর্জিপাড়া-ডাঙ্গাপাড়া এলাকার মানুষের ভাগ্য থমকে আছে একটি সেতুর অভাবে। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের গবরা নদী উন্নয়নের পথে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প পথে যাতায়াত করতে গেলে মাইলের পর মাইল বাড়তি পথ ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুই-ই অপচয় হয়। গবরা নদীর বুকে সেতুর দাবি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের। নদীটির আশপাশে প্রায় ১০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, এখানে একটি সেতু হোক, ঘুচে যাক যাতায়াতের আজন্ম কষ্ট।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রকৌশলী ইদ্রিস আলী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই স্থানে সেতু নির্মাণের জন্য নথিপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশার বাণী শুনিয়েছেন তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহিন খসরুও। এ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন বলেন, আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। জেলা প্রশাসক ব্রিজ নির্মাণের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। আমরা দ্রুত একটি রিপোর্ট তৈরি করছি। শিগগির এখানে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ইউএনও আফরোজ শাহিন খসরু।
জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত পরিবেশ ও শিক্ষাকর্মী মাহমুদুল ইসলাম মামুন এই পরিস্থিতিকে গুরুতর বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, এখানে আধুনিকতার কথা বলা হলেও এই গ্রামগুলোকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। নদী পার হতে গিয়ে অতীতে বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এখানে। বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশে এই অবহেলিত জনপদের দাবি পূরণ হওয়া এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে যায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের দর্জিপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, কানকাটা, শারিয়ালজোত, প্রেমচরণজোত, আজিজনগর, কলেজপাড়াসহ প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই নদী পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করেন। নদীর আশপাশে রয়েছে ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আরও আছে শিশু শিক্ষা মক্তব, ইবতেদায়ি, নুরানী এবং কওমি মাদরাসার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নদীর এক পাড়ে কৃষিজমি আর অন্য পাড়ে স্কুল-কলেজ আর হাটবাজার। একটি সেতুর অভাবে অনেক সময় শিশুদের কাঁধে করে নদী পার করে স্কুলে দিয়ে আসতে হয় অভিভাবকদের। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন নদীর পানি বেড়ে যায় তখন ভোগান্তি আরও চরমে পৌঁছায়। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কিংবা কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া হয়ে পড়ে প্রায় অসম্ভব। স্থানীয়দের আক্ষেপ রাজনৈতিক নেতাদের ওপর। নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা এখানে আসেন রঙিন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে। কিন্তু পরে আর কোনো খোঁজ রাখেন না। কথা হয় দর্জিপাড়ার বাসিন্দা শেখ ফরিদ হোসেনের সঙ্গে। এ সময় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সরকার আসে-যায়, কিন্তু আমাদের ব্রিজ আর হয় না। নির্বাচনের আগে নেতারা বলেন, এই তো ব্রিজ হয়ে যাবে! কিন্তু ভোট শেষ হয়ে গেলে তাদের আর দেখা মেলে না। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, নদীতে সেতু না থাকায় বর্ষাকালে আমাদের খুব সমস্যা হয়। বাচ্চা-কাচ্চাদের অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। আব্দুল কাদের আরও বলেন, সেতু না থাকায় বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়। এ জন্য ছয়-সাত কিলোমিটার অতিরিক্ত রাস্তা ঘুরে যেতে হয়। তাই আমাদের আকুল আবেদন ব্রিজটা যাতে দ্রুত করে দেওয়া হয়।
শিশু শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তার মিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেতু না থাকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে। বর্ষাকালে বইপত্র ভিজে যায়।
সময়ের আলো/এনএ