সংগৃহীত ছবিসব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সরকার। নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকা বা তারও বেশি করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য গ্রেডেও প্রায় একই হারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। নবম বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন বুধবার (২১ জানুয়ারি) তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেবে। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও উপস্থিত থাকবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, নতুন পে-কমিশনে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধিসহ সরকারি চাকরিজীবীদের আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে বলে জানা গেছে। এই বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি চলতি জানুয়ারি মাস থেকে আংশিক এবং আগামী জুলাই মাস থেকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে কমিশন। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে এই কাঠামো। বুধবার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধাপে বর্তমানে ৭৮ হাজার টাকা বেতন থাকলেও তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
বর্তমানে ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং নবম গ্রেডে (বিসিএস কর্মকর্তা) ২২ হাজার টাকা। সচিবদের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ৮৬ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা রেখেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে জানান, জানুয়ারি ২০২৬ থেকেই মূল বেতন অথবা ভাতার যেকোনো একটি অংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে এই বিশাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাকি অংশ পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে। সে হিসাবে চলতি জানুয়ারি মাস থেকেই একটি নতুন বেতন কাঠামো একটি অংশ বাস্তবায়ন করা হবে। আর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে।
এদিকে নতুন পে-স্কেলে চিকিৎসা ও বৈশাখী ভাতায়ও আসছে বড় চমক। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখ উদযাপন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বৈশাখী ভাতা এবং চিকিৎসা ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
পে-কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মচারীদের বৈশাখী ভাতা বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার চূড়ান্ত সুপারিশ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতায় বয়সভিত্তিক বাড়ানোর সুপারিশ থাকছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বর্তমান ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, তাই দুই ক্যাটাগরিতে এই ভাতা নির্ধারণের সুপারিশ করা হচ্ছে। যেমন- ৪০ বছর বা তার কম বয়সিদের জন্য মাসিক ৪ হাজার টাকা। ৪০ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য মাসিক ৫ হাজার। আর অবসরপ্রাপ্তদের জন্য অবসরের পরও একজন সরকারি চাকরিজীবী প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। তবে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার বোনাস বা উৎসব ভাতা আগের নিয়মেই বহাল থাকবে, সেখানে কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব নেই।
জানা যায়, গত বছরের জুলাই মাসে গঠিত ২১ সদস্যের বেতন কমিশন সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। এখন সেই প্রতিবেদন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে জমা দেওয়া হবে বুধবার।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মূল বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকার পুরোটা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য নয়। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ব্যয়ও এ বরাদ্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে পে-কমিশন গঠন করা হয়। বর্তমানে ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা পান। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও পরে তা স্থগিত হয়। গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় : এদিকে যখনই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয় তখনই সারা দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, ব্যাপক প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর। বাড়ি ভাড়া বেড়ে যায়, বাড়ে গাড়ি ভাড়াও। সব ধরনের জিনিসপত্রে দাম বাড়ে অস্বাভাবিক হারে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচাক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিতে পে-কমিশন গঠন করেছে। সে কমিশন তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে সরকারের কাছে। সুতরাং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে অতীতে যখনই সরকারি কর্মীদের বেতন বেড়েছে, তখনই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের যেমন বেতন বাড়ছে, তেমনি বেসরকারি সব খাতের কর্মীদেরও বেতন বৃদ্ধি করা দরকার। তা না হলে বেসরকারি খাতের লোকদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে।’
নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীরা সন্তুষ্ট হবেন, অর্থ উপদেষ্টা : এদিকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে গঠিত পে-কমিশন আগামীকাল বুধবার (আজ) প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কমিশন সদস্যরা সরকারি কর্মচারীদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই সুপারিশ প্রস্তুত করেছেন এবং এতে তারা সন্তুষ্ট হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে না। রিপোর্টটি জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হবে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। ফলে এটি কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
বেতন বৃদ্ধি বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজারে এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। কারণ সরকার সরবরাহ পক্ষ (সাপ্লাই সাইড) শক্তিশালী রাখার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় বেতন বৃদ্ধি নির্বাচনি প্রভাব ফেলতে পারে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি জানান, এবারের পে-কমিশন কাজের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কমিশন সদস্যরা বহুবার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, ছাত্র, বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী ও বয়স্ক নাগরিকদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সবার চাহিদা হুবহু বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও তাদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা সুপারিশে প্রতিফলিত হবে। তবে কমিশনের সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন হবে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এনএ