সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে জোড়া মরদেহ উদ্ধারের রোমহর্ষক ঘটনার পর একে একে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। গ্রেফতারকৃত ঘাতক সবুজ শেখ (৪০) ওরফে মশিউর রহমান সম্রাট নিজেকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ বাস্তবতা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সে একজন ঠান্ডা মাথার সিরিয়াল কিলার। গত সাড়ে ছয় মাসে অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সবুজ।
জানা গেছে, গত ১৮ জানুয়ারি সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুইজনের অগ্নিদগ্ধ মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ তদন্তে নেমে সবুজ শেখের সন্ধান পায়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডগুলোকে সে তার নিজস্ব কোড ল্যাংগুয়েজে ‘থার্টি ফোর’ নামে অভিহিত করত। গ্রেফতারের পর একে একে ছয়টি হত্যার কথা স্বীকার করে সে।
তদন্তে জানা যায়, গত তিন বছর ধরে সবুজ শেখ সাভার মডেল থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকার আশপাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করত। স্থানীয়দের কাছে সে ‘সম্রাট’ নামে পরিচিত ছিল। দিনে পাঁচ থেকে সাতবার পোশাক পরিবর্তন, কানে হেডফোন লাগিয়ে দামি স্পিকারে গান শোনা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কেউ তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করলেও, আবার অনেকে তার আচরণ দেখে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য বলেও সন্দেহ করত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, সবুজ নিয়মিত পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে বিভিন্ন সদস্যকে ফোন করে এলোমেলো কথা বলত। এমনকি, সর্বশেষ জোড়া মরদেহ উদ্ধারের মাত্র দুই দিন আগেও এক পুলিশ সদস্যকে ফোন করে কথাবার্তার একপর্যায়ে ‘দুটি লাশ উদ্ধারের’ ইঙ্গিত দেয় সে।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন জানান, গ্রেফতারের পর সবুজের ব্যাগ তল্লাশি করে একাধিক সিম কার্ড, ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের নামের তালিকা এবং ফোন নম্বর উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে সে নিজেকে মশিউর রহমান সম্রাট পরিচয় দিলেও পরে জানা যায় তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায়।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সবুজ দাবি করেছে, যারা ‘অসামাজিক কাজ’ করত তাদেরই সে হত্যা করত। তবে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ভিন্ন তথ্য দেয়। তার ভাষ্যমতে, যে পরিত্যক্ত ভবনে সে থাকত, সেখানে অন্য কেউ প্রবেশ করলে বা থাকতে শুরু করলে সে তা সহ্য করতে পারত না এবং তাদের হত্যা করত।
এদিকে সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া দুই মরদেহের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি তানিয়া আক্তার, যিনি অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। গত ১ জানুয়ারি উত্তরা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।
অন্য মরদেহটির পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) আরাফাতুল ইসলাম বলেন, সবুজ অত্যন্ত কৌশলী ছিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছিল। তবে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তার সঙ্গে আরও কোনো অপরাধ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এফআর