পাড়া-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান কিংবা টকশোর টেবিল, সব জায়গায় আলোচনা একটাই- জাতীয় নির্বাচন। ভোটারদের দাবি ও প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, সব মিলিয়ে আজ থেকে জমে উঠছে নির্বাচনি মাঠ। কথা একটাই- দেখা হবে বিজয়ে...।
বুধবার প্রতীক বরাদ্দের পর আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীদের আবেগ ও কর্মীদের উচ্ছ্বাস দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা উৎসবমুখর হতে যাচ্ছে এ নির্বাচন।
নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে বুধবার প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নিতে এবার সারা দেশে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিল ৩ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্য থেকে মনোনয়ন দাখিল করেছিল ২ হাজার ৫৮০ জন। এর মধ্য থেকে গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ঝরে পড়ে ৭২৫ জন। চূড়ান্ত বাছাই শেষে ৩০০ আসনের বিপরীতে ১ হাজার ৮৫৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল ইসি। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশনের আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল ৬৪৫ জন।
এরপর গত ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৯ দিনের আপিল শুনানি করে ইসি। এতে ভোটের মাঠে ফিরে ৪৩৬ জন প্রার্থী। সেই সঙ্গে ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব, স্বতন্ত্রদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটের সমর্থনে গড়মিল, হলফনামায় অসংগতি ও মনোনয়নপত্র দাখিলে ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণে ২০৯ জনের প্রার্থিতা বাতিল করে আপিল ট্রাইব্যুনাল। বাতিলকৃতদের মধ্যে ছিল রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক
বাছাইয়ে বৈধ ৫ জন প্রার্থী। ইসির চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষে মোট বৈধ প্রার্থী দাঁড়ায় ২ হাজার ২৯১ জনে। এর মধ্য থেকে ১৯ ও ২০ জানুয়ারি দুই দিনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ভোটের মাঠ থেকে সড়ে দাঁড়ান ৩০৫ জন, ফলে ভোটযুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াইয়ে থেকে যান ১ হাজার ৯৭২ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এবার ভোটের মাঠে জোটভুক্ত দলগুলোকে নিজ দলীয় প্রতীকে ভোট করতে হবে। তবে ভোটের মাঠে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা লড়ছেন ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে ও ঢাকা-৯ আসনে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে লড়বেন আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা।
আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে প্রচার, যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আজ থেকে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটবেন প্রার্থীরা। ভোটের প্রচারমুখর হয়ে উঠবে নির্বাচনি মাঠ। গতকাল সিলেট মাজার জিয়ারত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেছেন ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে বিকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে এক জনসভার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিন নেতার মাজার ও শহিদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করবেন নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
প্রচারের ক্ষেত্রে মানতে হবে যেসব বিধিনিষেধ : সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই প্রচার করবে প্রার্থীরা। তবে এ ক্ষেত্রে মানতে হবে বেশ কিছু নির্দেশনা। না হয় আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইনে প্রচারের ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীকে সাতটি নির্দেশনা মানতে হবে। এগুলো হলো- একজন প্রার্থী তার নির্বাচনি এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ফেসবুক বা অন্যান্য যেসব প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালাবেন, সেগুলোর নাম, আইডি, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচনি প্রচারে কোনোভাবেই অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, কারও ছবি বিকৃতি করা বা ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনোরকম ঘৃণামূলক, উসকানিমূলক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতিকে ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না। নির্বাচনি স্বার্থে ধর্ম বা জাতির অপব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সামাজিকমাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো পোস্ট বা তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। গুজব, বিভ্রান্তিকর পোস্ট কিংবা যাচাই না করা তথ্য প্রচার করা যাবে না। প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো দল, প্রার্থী বা তাদের সমর্থকরা কারও সুনাম নষ্ট বা চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, সম্পাদনা, প্রচার বা শেয়ার করতে পারবেন না। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ থাকবে। এ ছাড়া অফলাইন বা সরাসরি প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচন কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচার করতে পারবেন না। পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না।
একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবেন। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবেন না। যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, শুধু সেগুলোতে আলো ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তবে আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। ভোটের প্রচারে ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা ও আচরণবিধি মানতে প্রার্থী ও দলের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
আচরণবিধি পালনে ইসির সতর্ক ইসি : ভোটের মাঠে যাতে কোনো প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছে নির্বাচন কমিশন। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে নির্বাচনি অনিয়ম অনুসন্ধান ও অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য ‘নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’ গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নামানো হবে।
এ বিষয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, কেউ যদি আচরণবিধি না মানে সে ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের শাস্তি দেবে। আমাদের আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া আছে। তিনি বলেন, আমরা দেড় মাস আগে তফসিল ঘোষণা দিয়েছি।
এ পর্যন্ত এক মাস হয়ে গেল। আমরা গুরুতর তেমন কিছু এখনও দেখিনি। প্রচারের মাঠে কিছু হবে কি না সেটি হাইপোথিক্যাল। আশা করি সব দলই সংযত আচরণ বজায় রাখবেন। যে যার মত প্রকাশ করবেন। পরস্পরের মধ্যে যেন কোনো সংঘর্ষ না হয়। একে অন্যের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে। আমার মনে হয় এ নির্বাচনে সেটি তারা করেছে।
সময়ের আলো/কেএইচও