চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কালিরবাজার এলাকায় ধনাগোদা নদী এখন কার্যত অচল। কচুরিপানার জমাট, অবৈধ জাগ স্থাপন ও দখলদারিত্বের কারণে গত চার মাস ধরে এই নদীতে নৌ-চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কথা হয় মতলব উত্তর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিমের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, ধনাগোদা নদী আজ অবহেলা আর দখলদারিত্বের শিকার হয়ে মরতে বসেছে। বছরের পর বছর আমরা শুধু আশ্বাসই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। মতলব উত্তর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম আরও বলেন অবৈধ জাগ, কচুরিপানার আগ্রাসন, খননের অভাবে নদী আজ মানুষের কাছে দুর্ভোগ হয়ে উঠেছে। অবিলম্বে কচুরিপানা অপসারণ, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ এবং নদী খননের কাজ শুরু না হলে কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হব আমরা।
সরেজমিন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, শ্রী রায়েরচর ব্রিজ থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত ধনাগোদা নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কচুরিপানা জমাট বেঁধে আছে। এই অংশে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে নৌ-চলাচল। একই সঙ্গে অচল হয়ে পড়েছে নদীপথের অন্তত ৮টি লঞ্চঘাট। ফলে মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ এবং পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া ও দাউদকান্দি উপজেলার সঙ্গে নৌ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অবৈধ জাগ ও দখলদারিত্বের কারণে মরতে বসেছে নদী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধনাগোদা নদীর দুই পাড়ে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে জাগ (মাছ ধরার ফাঁদ) বসানো হয়েছে। ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কচুরিপানা সরে যেতে না পেরে নদীতে জমাট বেঁধেছে। এতে নদীটি সবুজ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নিয়মিত খনন না হওয়ায় নদীটি দিন দিন ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীরা এই নদীপথ দিয়েই ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য আনা-নেওয়া করতেন। কিন্তু দখল, দূষণ, অবৈধ জাগ ও কচুরিপানার আগ্রাসনে সেই নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, এই নদীপথেই মতলব উত্তরের ধনাগোদা তালতলী উচ্চ বিদ্যালয় এবং দাউদকান্দির মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা চলাফেরা করত। এ ছাড়া দাউদকান্দি, মতলব উত্তর, গজারিয়া উপজেলার লোকজনও এই নৌপথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
কিন্তু নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দারা। উপায় না পেয়ে স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে কোনোরকম যাতায়াত করছেন কোমলমতি শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষসহ এলাকার সাধারণ মানুষ। একদিকে নদীর বুকে কচুরিপানার সাগর, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পেরিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা।
মোল্লাকান্দি লালমিয়া পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, নৌকা না থাকায় প্রতিদিন স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পার হতে হয় আমাদের। বর্ষায় বৃষ্টি হলে আর শীতকালে ঘন কুয়াশায় সাঁকো পার হতে খুব ভয় লাগে। তবুও উপায় নেই।
কালিরবাজারের ব্যবসায়ী শাহজালাল বলেন, নদীটা আমাদের জীবনরেখা ছিল। এখন সেই নদী কচুরিপানার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন যদি আগে ব্যবস্থা নিত তা হলে আজ আমাদের এভাবে ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হতে হতো না।
স্থানীয়রা দ্রুত ধনাগোদা নদী খনন, অবৈধ জাগ উচ্ছেদ, কচুরিপানা পরিষ্কার এবং দখলমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, নদী বাঁচলে বাঁচবে জনপদ। নইলে ধনাগোদা হয়ে যাবে একটি মৃত নদী।