কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ শিখতে বিদেশযাত্রা

আদিল সরকার

ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকা; সবখানেই দেখা মেলে বিপুলসংখ্যক কুকুরের। এরা শিকারি ও মৃতভোজী হিসেবে প্রাণীর সংখ্যা

2026-01-22T10:03:15+00:00
2026-01-22T10:03:15+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ শিখতে বিদেশযাত্রা
আদিল সরকার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:০৩ এএম 
ফাইল ছবি
ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকা; সবখানেই দেখা মেলে বিপুলসংখ্যক কুকুরের। এরা শিকারি ও মৃতভোজী হিসেবে প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাস্তুসংস্থানে ভূমিকা পালন করে। তবে এর বিপরীত বাস্তবতাও রয়েছে। কুকুরের কামড়ে প্রতিনিয়ত মানুষ আহত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং এই প্রাণী প্রজাতিকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে নতুন এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শিখতে বিদেশে যাবেন সরকারি চার কর্মকর্তা। সম্পূর্ণ অনুদানের এই প্রকল্পটির তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় থাকবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষ কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়, যাদের একটি বড় অংশই শিশু। এমন পরিস্থিতিতে কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হলো। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমন প্রকল্প এবারই প্রথম। তবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না সেই শঙ্কা রয়েছে। বাস্তবিক অর্থে রাজধানীর সব কুকুরকে এমন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা যাবে কি না সেই চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতির এমন মন্থর গতিতে সচেতনতার কথা শুনিয়ে প্রকল্পটিতে এত টাকার অনুমোদন দেওয়ার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও কম টাকায় এই কার্যক্রম করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা।

জানা যায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘পথ কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। সম্পূর্ণ জিওবির (অনুদান) আওতায় প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪২ কোটি ৬৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুকুরের মাধ্যমে প্রাণীসহ মানুষের মধ্যে ছড়ানো মারাত্মক ভাইরাস রোগ জলাতঙ্কের কোনো চিকিৎসা নেই। ফলে আক্রান্ত প্রাণী ও মানুষের শতভাগ মৃত্যু হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যায়। এদিকে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ কুকুর, বিড়াল, শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। তবে গবাদি প্রাণীর ক্ষেত্রে কুকুর-বিড়ালের কামড়ের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৩২টি গবাদিপশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে জানা গেছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে বৈশ্বিক কর্মকৌশলের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে এই অবহেলিত রোগটির বিরুদ্ধে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। ফলে দেশব্যাপী জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকাদান (এমডিডি) কার্যক্রমের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম রাউন্ড হিসেবে চারটি জেলায় এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে ১৬টি জেলায় আরও আনুমানিক পাঁচ লাখ কুকুরকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, দেশের সব জেলায় ৬৭টি জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুর কামড়জনিত জলাতঙ্কমুক্ত বিশ্ব হবে এ অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিডিসি জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল বিভাগ ‘টিকার মাধ্যমে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ হয়’ জনসচেতনতামূলক এই কর্মসূচি ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। কিন্তু দেশ থেকে এই রোগ নির্মূলে প্রয়োজন কুকুরকে জলাতঙ্ক থেকে নিরাপদ করা। কোনো এলাকার শতকরা ৭০ শতাংশ কুকুরকে ব্যাপক হারে টিকা দিলে ওই এলাকার কুকুরের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। পরপর তিন বছর তিন রাউন্ড টিকা দিলে কুকুর থেকে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর শরীরে সংক্রমণের হার শূন্যের কোটায় নেমে আসবে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। ২০২২ সালের প্রতি মিলিয়নে একজনের কম এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কুকুরের গণটিকাদান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সমন্বয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করছে।

এদিকে প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে ১০ জনকে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ প্রদান; চারজনকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ প্রদান; সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন; প্রাণীটিকা ও ওষুধ ক্রয়; পথ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ; নিউটারকৃত কুকুরের খাদ্য ক্রয়; পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ; তিনটি ডেক্সটপ কম্পিউটার (এক্সেসরিজসহ), একটি ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, একটি প্রজেক্টর স্ক্রিন ও অন্যান্য অ্যাক্সেসরিজ, একটি ফটোকপি মেশিন, একটি আইপিএস, ছয়টি এয়ারকুলার ও আসবাবপত্র ক্রয়; সিডিএইচ পেট ক্লিনিকের জন্য সার্জারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয় এবং স্টোটক ক্লিনিক আপগ্রেডেশনের আওতায় সিভিএইচএর পেট ক্লিনিক নির্মাণ করার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে। যেখানে মোট খরচ ধরা হয় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠাতে চারজন কর্মকর্তার জন্য ২৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

যেকোনো প্রকল্পে প্রশিক্ষণে বিদেশে কর্মকর্তা পাঠিয়ে টাকা ব্যয়ে আর্থিক অনিয়মের ঘটনাই বেশি দেখা যায়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেও বেশ কিছু অসঙ্গতির দেখা মেলেছে, যা লিখিতভাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানানো হয়েছে। এ সময় প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য সিডিএইচর পেট ক্লিনিকের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত না করা; প্রকল্পে চারজন ভেটেনারি সার্জন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনজন ভেটেনারি সার্জন পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরেও কুকুরকে নিউটার করার কাজে নিয়োজিত ভেটেনারি সার্জনদের সম্মানী হিসেবে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংস্থান রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে আবারও আলোচনা করার মতামত দেয় কমিশন। এ ছাড়া সিডিএইচ পেট ক্লিনিকের জন্য সার্জারি ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা সংস্থান রাখা হলেও তার স্পেসিফিকেশন এবং বাজারদর যাচাই সংক্রান্ত কোনো তথ্য ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি বলেও জানানো হয় কমিশন থেকে।

প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উইংয়ের প্রধান অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় সময়ের আলোকে বলেন, প্রকল্পটির পিইসি হয়েছে। পরে আমরা যথারীতি কার্যকর করে পাঠিয়েছে প্রিকাস্ট করার জন্য। তবে এমন প্রকল্প এবারই প্রথম।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ জামান বলেন, জলাতঙ্ক রোধ করতে এমন উদ্যোগ ভালো। তবে এ ধরনের প্রকল্প যথেষ্ট পরিমাণ রিভাইস করার সুযোগ আছে। মনে হচ্ছে এটিতে অতিরিক্ত বাজেট করা হয়েছে। তিনি বলেন, রিভাইস করলে এর টাকার পরিমাণ কমে আসবে। কম বাজেটেই কাজটা করা সম্ভব হবে। এটিতে ১৫-২০ কোটি টাকাই এনাফ বলে মনে করি। এদিকে রাজধানীর ৭০ শতাংশ কুকুরকে এ টিকা দেওয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে এই পরিবেশবিদ সময়ের আলোকে বলেন, পৃথিবীর কোথাও এমন দৃশ্য নেই যে প্রাণীকে ধরে ঢালাও টিকা দেয়। এটি ব্যাক অবজেক্ট। যা একদমই অসম্ভব। আমি যেহেতু জন্মই নিয়ন্ত্রণ করব তা হলে টিকার দিকে যাব কেন? এটি ব্যাপক হারে করা সম্ভব নয়।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: