যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরপরই অন্যদের মতো বাংলাদেশের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছে। সর্বশেষ ২৫টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ওপরও ভিসা বন্ড আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের আগে বাইডেন প্রশাসনও বাংলাদেশের ওপর নানা চাপ তৈরি করে। কূটনীতিকরা বলছেন, সামনে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং মিয়ানমার ইস্যুতে এটি বাড়তে পারে।
কূটনীতিকরা বলছেন, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন রাষ্ট্রদূত পদে মনোনীত হওয়ার আগে গত অক্টোবর মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র-বিষয়ক কমিটিতে নেব্রাস্কা থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান পার্টির সিনেটের পিট রিকেটসের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্ন করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত (তখনও তিনি চূড়ান্ত মনোনীত হননি) ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব নিয়ে আপনার উদ্বেগের সঙ্গে আমি একমত। আমার মনোনয়ন নিশ্চিত (রাষ্ট্রদূত হিসেবে) হলে বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে চীনের কর্মতৎপরতা, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা, তাদের সামুদ্রিক এলাকায় কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় চীনের ভূমিকার ঝুঁকি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের সুযোগ ও সুফলগুলোও তুলে ধরব, বিশেষ করে আমাদের দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আরও নিবিড় সহযোগিতার বিষয়টি।
এরপর রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন শপথ নেওয়ার পর ১২ জানুয়ারি ঢাকায় আসার এক সপ্তাহ আগে ৬ জানুয়ারি ২৫টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ওপরও ভিসা বন্ড আরোপ করার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার থেকে এই ভিসা বন্ড বাংলাদেশি সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দূতের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে ঢাকার ওপর ওয়াশিংটনের চাপ দেখেই অনুমান করা যায় যে সামনের সময়গুলো আরও বৈরিতার হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যে যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না তা দেশটির রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে স্পষ্ট। প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কার ওপর ভিসা বন্ডের চাপ না থাকলেও ঢাকার ওপর ওয়াশিংটনের ভিসা বন্ড আরোপ বার্তা দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি অভিবাসীদের ইতিবাচক দেখছে না।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রি করতে চায়। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যেও এই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত আর্ল বরার্ট মিলার ২০২৮ সালেই বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রির ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। গত ৮ বছর ধরে এই ইস্যুতে ওয়াশিংটন ঢাকাকে চাপে রেখেছে।
দুই পক্ষের মধ্যে এই ইস্যুতে চলমান ধারাবাহিক বৈঠক এখন শেষের স্তরে। পশ্চিমের এই দেশটি চায় যে জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট) এবং আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিং এগ্রিমেন্ট) নামের দুটি সামরিক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিক বাংলাদেশ। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পরপরই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন, জ্বালানিসহ একাধিক পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশকে বাধ্য করেছে। মার্কিন বাণিজ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র আর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এ ছাড়া অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর একটি উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। ইতিমধ্যে গত এক বছরে ২৫০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানিয়েছে, বাংলাদেশের তিনটি শীর্ষ সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান- মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ এবং ডেল্টা অ্যাগ্রো আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন কেনার ঘোষণা দিয়েছে। দূতাবাস আরও জানিয়েছে, ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টার চালান। ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে আসা এই চালানকে স্বাগত জানায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। চালানটিতে ২০২৫-২০২৬ ফসল মৌসুমে নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ও মিনেসোটায় উৎপাদিত ৫৭ হাজার ৮৫৫ মেট্রিকটন হলুদ ভুট্টা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ভ্যাঙ্কুভার বন্দর থেকে জাহাজে পাঠানো হয়েছে। গত ৮ বছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পশুখাদ্য প্রস্ততকারকদের প্রাণী পুষ্টির একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের ভুট্টা ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে এই সরবরাহ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান একসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকা অনুবিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামী দিনগুলোয় যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এর অনেকটা নির্ভর করে বাংলাদেশের আগামী সরকারের ওপর। বাংলাদেশে চরম ভারত-বিরোধিতা বজায় থাকায় এবং চরমপন্থার উত্থান ঘটায় সরকার এমনিতে স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে যথেষ্ট চাপের মধ্যে থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে অভিনব কায়দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রথাগত আগ্রাসী নীতি দৃশ্যমান হওয়ায় বাংলাদেশ কার্যত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বাংলাদেশ যদি দ্রুত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক করতে না পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে লাভজনক ও সহজ বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে না পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার মুখে পড়বে। কেননা তখন সারভাইভালের জন্য বাংলাদেশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও চীনের ঋণফাঁদে পড়বে। সামনের দিনগুলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য আমি তাই ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং মনে করি।
এএডি/