তারেক জিয়া সাবকে জীবনে কখনো দেখি নাই। সিলেটের জামাই। তাইনেরে এক নজর দেখিবার লাগিয়া আইছি—এভাবেই সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় নিজের সরল অনুভূতি প্রকাশ করেন কানাইঘাট উপজেলার কৃষক কামাল উদ্দিন। তিনি বুধবার রাত থেকেই সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অবস্থান করছেন। উদ্দেশ্য—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সামনাসামনি এক নজরে দেখা।
কামাল উদ্দিন পেশায় একজন কৃষক। বর্গাচাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। তার বেশভূষা ও কথাবার্তায় ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের সরলতা। হাতে একটি ছোট ফেস্টুন। তিনি কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন, রাজনীতির সঙ্গেও নেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। একমাত্র ইচ্ছা—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে দেখা। যিনি দীর্ঘ ২২ বছর পর সিলেটে এসেছেন। এক মাস আগে দেশে ফেরার পর এটিই ঢাকার বাইরে তার প্রথম সফর।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জনসমুদ্রে পরিণত হতে শুরু করে সমাবেশস্থল। কুয়াশা কাটিয়ে সকালের রোদ উঁকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। চোখে-মুখে ফুটে ওঠে প্রত্যাশা। ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের দিকে তাকিয়ে যেন পুরো শহর অপেক্ষা করছে—কখন শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই জনসমাবেশ।
কামাল উদ্দিনের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঁচজন তরুণ। তাদের কারও হাতে ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়চিহ্ন নেই। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠেই তাদের সঙ্গে কথা হয়। যেখানে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে তারেক রহমান ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন। তরুণরা জানান, তারা কখনো তারেক রহমানকে দেখেননি। আবার তিনি কবে সিলেটে আসবেন, সেটিও অনিশ্চিত। তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। সে কারণে আগেভাগেই মঞ্চের সামনে জায়গা করে নিয়েছেন তারা।
বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকেই তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করছেন। আজ সকালে সিলেট শহরের এই জনসভার মাধ্যমে শুরু হচ্ছে তার নির্বাচনী যাত্রা। এর মধ্য দিয়ে তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবেই নয়, জীবনের প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটের মাঠে নামছেন।
নির্বাচনী প্রচারে দিনভর ব্যস্ত সময় কাটাবেন মাসখানেক আগে দেশে ফেরা বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। ঢাকায় ফেরার পথে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইতে অংশ নেবেন সাতটি পথসভায়। একই সঙ্গে দলের ধানের শীষ প্রতীকের মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেবেন। প্রচারের প্রথম দিনে তার সঙ্গে থাকবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূলের সেবা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ভোট আদায়ের আহ্বান জানাবেন তারা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে এই প্রথম ঢাকার বাইরে সফরে এসেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরাণের (রহ.) পুণ্যভূমি সিলেটেই শুরু হচ্ছে বিএনপির নির্বাচনী প্রচারের আনুষ্ঠানিকতা।
সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের ভাষ্যে উঠে আসে ভিন্ন এক আবেগ। তাদের মতে, নির্বাচনী প্রচারণার বাইরেও ২২ বছর পর তারেক রহমানের সিলেট আগমন ঘিরে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশেষ আবেগ ও উচ্ছ্বাস।
দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর পর বুধবার রাত ৮টার দিকে পরিবারসহ সিলেটে পৌঁছান তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহ পরাণ (রহ.) এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর কবর জিয়ারত করেন। এরপর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামে যান।
সেখানে তিনি জুবাইদা রহমানের পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কবর জিয়ারত করেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং জুবাইদার পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মিলাদ শেষে তারেক রহমান, সফরসঙ্গী, দলীয় নেতা-কর্মী ও স্থানীয়দের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়, যা ‘শিরনি’ হিসেবে বিতরণ করা হয়। শ্বশুরবাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটিয়ে তিনি পাঁচ তারকাবিশিষ্ট গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে রাত্রিযাপন করেন।
শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পথে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড ও তোরণ নির্মাণ করা হয়। কোথাও লেখা ছিল—‘দুলাভাইকে পুণ্যভূমিতে স্বাগতম’, কোথাও ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগতম’।
বিমানবন্দর থেকে মাজার সড়ক পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে স্বাগত জানান। তিনি বাসের ভেতর থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে অরাজনৈতিক তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান। পরে বেলা ১১টার দিকে নগরের চৌহাট্টা এলাকার সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন। এর মাধ্যমেই পুণ্যভূমি সিলেট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে।
আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ ঘুরে দেখা যায়, চারপাশ সাজানো হয়েছে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানানো ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। আশপাশে হকাররা বিক্রি করছেন প্লাস্টিকের ধানের শীষ, কোটপিন, বিএনপির পতাকা এবং জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি।
বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নেতাকর্মীরা আগের রাত থেকেই মাঠে অবস্থান নিয়েছেন। তারা ধানের শীষের পক্ষে নানা স্লোগান দিচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীদের সমাবেশে যোগ দিতে দেখা যাচ্ছে।
এদিকে জনসভা ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।
/ইউএমএইচ