দেশে
সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর
মধ্যে গত বুধবার ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীর জন্য নতুন বেতন
কাঠামোর সুপারিশ করেছে সরকার। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০তম
গ্রেডে বেতন বাড়ানোর হার ১৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে
১০৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। সুপারিশে চলতি জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং আগামী
অর্থবছরের শুরু থেকে পুরোপুরি বেতন কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি
চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, ২৪ লাখ সরকারি বেতনভোগীর
বেতন বাড়লে পৌনে ৫ কোটি বেসরকারি খাতের কর্মজীবীর বেতন বাড়ানোর বিষয়টির কী
হবে। সরকারি খাতের মতো বেসরকারি খাতের কর্মীদেরও কি বেতন বাড়বে। কেননা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে সব ধরনের
ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি পায়- সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি
বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবী
বাজারে গিয়ে যে দামে পণ্য কিনবেন, বেসরকারি খাতের কর্মজীবীকেও একই পণ্য একই
দামে কিনতে হবে। এই অবস্থায় সরকারি খাতের লোকদের বেতন বাড়ার পর যদি
বেসরকারি খাতের লোকদের বেতন না বাড়ে তা হলে বেসরকারি খাতের মানুষের
জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, একবারে
এতটা বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা ঠিক হয়নি। এতে সরকারের ওপর যেমন চাপ বাড়বে,
তেমনি চাপ বাড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। তবে দীর্ঘ এক যুগ পার হয়ে যাওয়ায়
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করার দরকার ছিল, কিন্তু সেটি
যুক্তিসংগতভাবে হওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, ‘সবসময় প্রতিটি সরকারই
সরকারি লোকদের খুশি করার জন্য বেতন বাড়ায়। কিন্তু তার বিপরীতে দেশের
মানুষের সরকারের যে সেবা পাওয়ার কথা, সে সেবার মান কি বাড়ে। বেতন বাড়ার পরও
তো সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় দেশের মানুষকে। সুতরাং শুধু
বেতন বাড়ালেই হবে না, সেবার মান বাড়িয়ে বেতনটা জায়েজ করতে হবে।’
গত
বুধবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করে
সাবেক অর্থ সচিব জাকির হোসেন খানের নেতৃত্বে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। এতে
সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানের
সর্বনিম্ন বেতনস্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকার প্রস্তাব
করা হয়েছে। ফলে এই গ্রেডে মোট বেতন হবে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা। এ ছাড়া
সর্বোচ্চ বেতনস্কেল ৭৮ (নির্ধারিত) হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার
টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। এভাবে মোট ২০টি গ্রেডে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা
হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির
সুপারিশ করা হচ্ছে ১০৫ থেকে ১৪২ শতাংশ। গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক
মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে কমিশন।
নবম জাতীয়
বেতনস্কেল (প্রস্তাবিত) অনুযায়ী, প্রথম গেডে প্রস্তাব করা হয়, ১৬০০০০ টাকা
(নির্ধারিত), দ্বিতীয় গ্রেডে ১৩২০০০-১৫৩০০০ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে
১১৩০০০-১৪৮৮০০ টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ১০০০০০-১৪২৪০০ টাকা, পঞ্চম গ্রেড
৮৬০০০-১৩৯৭০০ টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৭১০০০-১৩৪০০০ টাকা, সপ্তম গ্রেডে
৫৮০০০-১২৬৮০০ টাকা, অষ্টম গ্রেডে ৪৭২০০-১১৩৭০০ টাকা, নবম গ্রেডে
৪৫১০০-১০৮৮০০ টাকা, দশম গ্রেডে ৩২০০০-৭৭৩০০ টাকা, এগারোতম গ্রেডে
২৫০০০-৬০৫০০ টাকা, বারোতম গ্রেডে ২৪৩০০-৫৮৭০০ টাকা, তেরোতম গ্রেডে
২৪০০০-৫৮০০০ টাকা, চৌদ্দতম গ্রেডে ২৩৫০০-৫৬৮০০ টাকা, পনেরোতম ২২৮০০-৫৫২০০
টাকা, ষোলোতম গ্রেডে ২১৯০০-৫২৯০০ টাকা, সতেরোতম গ্রেডে ২১৪০০-৫১৯০০ টাকা,
আঠারোতম গ্রেডে ২১০০০-৫০৯০০ টাকা, উনিশতম গ্রেডে ২০৫০০-৪৯৬০০ টাকা এবং
বিশতম গ্রেডে ২০০০০-৪৮৪০০ টাকা।
এ ছাড়া সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ
করার সুপারিশ করা হচ্ছে। এত দিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য
যাতায়াতের ভাতা ছিল। এ যাতায়াতের ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম ধাপ থেকে ২০তম
পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করছে।
কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। মাসে ২০
হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। যারা
মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। আর যারা
মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ।
সরকারি
খাতের চাকরিজীবীর এই হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবের পর গতকাল বৃহস্পতিবার
সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সরকারি খাতের কর্মীরা এ খবরে
যারপরনাই আনন্দিত। গতকাল সচিবালয়সহ সব অফিসে এককরম খুশির আমেজ বয়ে গেছে।
বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন,
‘কমিশন যে হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে সরকার যেন সেটিই চূড়ান্ত করে-
এটিই আমাদের চাওয়া। আমরা খুবই আনন্দিত।
এদিকে ভিন্ন চিত্র বেসরকারি
খাতের চাকরিজীবীদের মাঝে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিজানুর
রহমান আজাদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘সরকারি লোকদের বেতন যে হারে বাড়ানো প্রস্তাব
করা হয়েছে- তাতে নিজেকে এখন হতভাগা মনে হচ্ছে। তাই আমরা যারা বেসরকারি
খাতে চাকরি করছি তাদের যদি বেতন না বাড়ে তা হলে আমরা তো উচ্চমূল্যে
চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাব। আমাদের তো আয় আরও কমে যাবে। তাই আমাদের প্রস্তাব-
বেসরকারি খাতের কর্মীদেরও যেন বেতন বাড়ানো হয়।’
এদিকে সরকারের
রাজস্ব খাতের বেতন বৃদ্ধির পর সরকারের স্বায়ত্তশায়িত, সামরিক বিভাগ, বিচার
বিভাগ, অন্যান্য সরকারি করপোরেশনে কর্মরতদেরও বেতন বাড়বে। এই বেতন কাঠামো
বাস্তবায়নের পর ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে তাদেরও বেতন বাড়ানো হয়- এটাই
রেওয়াজ।
তাই সরকারি খাতের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতি
বাড়বেই। গত তিন-চার বছর মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল, এখন ৮ থেকে ৯
শতাংশের কাছে। বেতন বাড়লে হয়তো মূল্যস্ফীতি বেড়ে আবারও ১০-এর ওপরে চলে
যাবে।
জানা যায়, যে হারে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে
সরকারকে বাড়তি অর্থের সংকুলান করতে হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এখন
বেতনবাবদ সরকারের ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বাড়তি বেতনের জন্য মোট
লাগবে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন
বেতনকাঠামোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেটি ইতিমধ্যেই সারা দেশের মানুষ জেনে
গেছে। সব ব্যবসায়ী শ্রেণিও জেনে গেছে। সুতরাং এখনই এর প্রভাব বাজারে পড়তে
পারে এবং জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়তে পারে। বাজারে এই যে জিনিসপত্রের
দাম বাড়বে, তা হলে সরকারি চাকরিজীবীরা যে বাজার থেকে পণ্য কিনবে, সেই একই
বাজার থেকেই তো একই দামে পণ্য কিনবেন বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরাও। পণ্য
বিক্রেতারা তো আর বলবেন না যে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কম দাম রাখব।
অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ায় বেসরকারি খাতের কর্মী, শ্রমজীবী সব
শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
তারা আরও বলেন,
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই যে দ্বিগুণেরও বেশি হারে বেতন বাড়ানোর
প্রস্তাব করল- এটা কিন্তু বাস্তবায়ন করতে হবে আগামী নতুন সরকারকে। ভঙ্গুর
অর্থনীতির মধ্যে ও রাজস্ব ঘাটতির মাঝে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা আগামী
সরকারের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের হবে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা
কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন,
সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডের একসঙ্গে বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে
প্রশ্ন রয়েছে। তার কারণ সরকারের বর্তমান রাজস্ব আয় কম। প্রত্যাশিত রাজস্ব
আদায় হচ্ছে না। এ অবস্থায় মোটা অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি হলে তা বাস্তবায়ন করা
সরকারের জন্য কঠিনই হবে।
সময়ের আলো/এসকে/