প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৪৮ এএম
ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত গোয়ালন্দ বাজার থেকে গোয়ালন্দ ঘাট রেলস্টেশন (দৌলতদিয়া) পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইনের এখন বেহাল দশা। ছবি : সময়ের আলোরাজবাড়ীর গোয়ালন্দে রেলওয়ের দুটি স্টেশনের মধ্যে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। শূন্য জনবলের কারণে বন্ধ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে দৌলতদিয়ায় অবস্থিত গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনও প্রকট ট্রেন সংকটে ভুগছে। এখানে চলাচলকারী ৫টি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ ৪টি ট্রেনই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বেসরকারিভাবে পরিচালিত একটি মাত্র লোকাল ট্রেন (শাটল) দিয়ে কোনোরকমে চলছে স্টেশনের কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের গণদাবি থাকা সত্ত্বেও গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে ট্রেনের সংখ্যা আজও বাড়েনি। ট্রেনের অভাবে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে সড়ক পথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন এলাকার ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ।
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাটের (দৌলতদিয়া) স্টেশন মাস্টার মোসলেম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ৫টি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ মোট ৪টি ট্রেন প্রত্যাহার করায় গুরুত্বপূর্ণ গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে প্রকট ট্রেন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন হয়ে পোড়াদহ রুটে বেসরকারিভাবে পরিচালিত এশটি লোকাল ট্রেন চলাচল করছে।
গোয়ালন্দ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি বন্ধ হয়ে আছে। আর গেটম্যানের অভাবে গোয়ালন্দ পৌরশহরের ব্যস্ততম স্টেশন সড়কে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিং সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার থাকলেও শাটল ট্রেন চলাচলের সময় তা নামানো হয় না। এতে যেকোনো সময় সেখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি জানিয়েছি। গোয়ালন্দ বাজার ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি সিদ্দিক মিয়া বলেন, ট্রেন সংকটে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্পআয়ের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। রেলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া মিটিয়ে তারা সড়কপথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গোয়ালন্দ ঘাট-খুলনা, গোয়ালন্দ ঘাট-রাজশাহী রুটে গোয়ালন্দ বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। প্রতিদিন এই স্টেশন থেকে বিভিন্ন ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এলাকার হাজারো মানুষ। এখানে স্টেশন মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার, তিনজন পয়েন্টসম্যান, দুজন গেটম্যানসহ সব পদেই প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল। পরবর্তী সময়ে স্টেশন মাস্টারসহ সব পদ শূন্য হয়ে যায়। এতে রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়। ১০ বছরেও এটি আর চালু হয়নি।
অন্যদিকে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত গোয়ালন্দ বাজার থেকে গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইনের এখন বেহাল দশা। এই ৫ কিলোমিটার রেলপথ হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। লাইনে নেই পাথর বা খোয়া, কাঠের সি্লপারগুলোর অবস্থাও ভালো নেই। দেখলে মনে হয় এটি অচল, দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত কোনো রেললাইন। শুধু মাটির ওপর নড়বড়ে নষ্ট কাঠের সি্লপারের ওপর বসানো রয়েছে রেল। এর ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলে হেলেদুলে। ট্রেন যাওয়ার সময় রেল ও সি্লপারগুলো উঁচু-নিচু হয়। ৫ কিলোমিটার রেলপথের পুরোটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। রেললাইনের সাপোর্ট হিসেবে কাঠের সি্লপার ছাড়া আর কিছুই নেই। অনেক সি্লপার ভেঙে গেছে, রেললাইনের নাটবল্টুও ঢিলা হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে রেললাইন। প্রায়ই ঘটে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে ভারত যাওয়া যেত। অথচ এখন বছরের পর বছর ধরে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ, কমেছে ট্রেনের সংখ্যাও। সারা দেশে রেলের উন্নয়ন হলেও এই ৫ কিলোমিটার রেললাইনের অবস্থা খুবই খারাপ। কোনোরকম নষ্ট-পচা কাঠের সি্লপারের ওপর বসানো রয়েছে রেল। এখানে একাধিকবার ট্রেন পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া লাইনে কোনো পাথর না থাকায় ট্রেন খুব আস্তে আস্তে যায়। হেঁটেই ট্রেনের চেয়ে আগে যাওয়া যায়। দৌলতদিয়া ঘাট স্টেশনের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ৫ থেকে ৬টি ট্রেন দৌলতদিয়া ঘাটে আসলেও এখন আর আসে না। পদ্মা সেতু হওয়ার পর ঘাট অনেকটাই মরে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের পথে বসতে হবে। এই লাইনে কিছু মেইল ট্রেন ও আন্তঃনগর ট্রেন দিলে সবাই উপকৃত হবে।
অন্যদিকে দৌলতদিয়ায় অবস্থিত গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন হয়ে প্রতিদিন দুটি আন্তঃনগর, একটি মেইলসহ মোট ৫টি ট্রেন বিভিন্ন রুটে নিয়মিত চলাচল করত। পরবর্তী সময়ে এখানে ট্রেনের সংখ্যা সংকোচন করে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রাজশাহী থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে নিয়মিত চলাচল করত মধুমতী এক্সপ্রেস নামের আন্তঃনগর একটি ট্রেন। ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর ওই ট্রেনটি গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এখন সেটা পদ্মা সেতু হয়ে রাজশাহী-ঢাকা চলাচল করে। নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস নামের অন্য একটি মেইল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট-খুলনা রুটে। বেসরকারিভাবে পরিচালিত ওই মেইল ট্রেনটিও গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয় ২০২৩ সালের ১ নভেম্বরে। সেদিন থেকে মেইল ট্রেনটি খুলনা-ঢাকা চলাচল করে পদ্মা সেতু হয়ে। এর আগে খুলনা-গোয়ালন্দ ঘাট রুটে চলাচলকারী তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ১৯৯৬ সালে প্রত্যাহার করে রাজশাহী-চিলাহাটি রুটে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে পার্বতীপুর থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন নিয়মিত চলাচল করত শিলিগুড়ি নামে পরিচিত লোকাল ট্রেন। ইঞ্জিন ও বগি সংকটের কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালে লোকাল ট্রেনটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনের হকাররাও পড়েছেন বিপাকে। তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আগে পাঁচ-ছয়টি ট্রেন চলাচল করার ফলে তারা অনেক বেচাকেনা করতেন। কিন্তু এখন ট্রেন না থাকায় তাদের আয় কমে গেছে। হকার কুতুব উদ্দিন বলেন, আমি আগে সারাদিন স্টেশনে প্রায় ১০০ পত্রিকা বিক্রি করতাম। এখন পত্রিকা বিক্রি অনেক কমে গেছে। আমি আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আরেক পত্রিকা বিক্রেতা সুমন বলেন, আগে একটা ট্রেন আসলে ২০-২৫ কপি পত্রিকা বিক্রি হয়ে যেত। এখন পদ্মা সেতু হওয়ায় ট্রেন নাই। এখন কোনোদিন দুয়েকটা পত্রিকা বিক্রি হয়, আবার কোনোদিন একটাও হয় না। আমি খুব কষ্টে জীবনযাপন করছি।
গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনের দোকানি মানিক বলেন, ট্রেন আগে কিছুক্ষণ পরপর আসত। অনেকগুলো ট্রেন চলত কিন্তু এখন এই লাইনে একটির বেশি ট্রেন চলে না। এ জন্য আমার দোকানের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়ছে।
গোয়ালন্দ ঘাটের বোর্ডিং মালিকদের অবস্থা আরও নাজুক। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর যেমন কমেছে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ির সংখ্যা, তেমনি ট্রেনের সংখ্যাও কমে গেছে। কাস্টমার না পাওয়ায় তাদের অনেক লোকসানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক মালিক বোর্ডিং বন্ধ করে দিয়েছেন অতিরিক্ত লোকসানের কারণে।
সময়ের আলো/এসকে/