অমাবস্যার মিজমিজে কালো রাত। গা শিউরে ওঠা নির্জনতা। ঘন কালো আঁধারে হু হু বাতাসের ধ্বনি ভয়াবহতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। শ্যাওড়াতলা কবরস্থান। বহু বছরের পুরোনো কবরের মাটি ফেটে ভাগ হয়ে যায়। ভয়ানক আঁধারে মাটিমাখা শরীরে বের হয়ে আসে বহুদিন আগে মরে যাওয়া মানুষটা। পাশের আরেকটা কবর থেকেও বের হয় আরেকজন। এভাবে শত হাজার, লাখ কোটি মরে যাওয়া সব মানুষ জীবিত হয়ে উঠে আসতে থাকে। তৈরি হয় বিশাল এক বাহিনী। জীবিতদের চেয়ে ওদের সংখ্যা বহুগুণ বেশি।
একবার মরেছে সুতরাং দ্বিতীয়বার মৃত্যু নেই ওদের, না গুলিতে না গলা কাটায় না বোমার আঘাতে কিংবা আগুনে বা রগ কাটায়। মরবো কেবল আমরা যারা বেঁচে আছি। বেঁচে আছি এবং প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছি এবং মরছি প্রতিদিন। আবার হত্যাও করছি গোপনে অথবা সরবে কাউকে না কাউকে, এই হত্যা মনস্তাত্ত্বিক কিংবা শারীরিক।
মৃত মানুষগুলো দলবেঁধে হেঁটে চলে সামনে। হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি মৃত মানুষ হেঁটে চলে। গ্রাম-পাহাড়-নদী পেরিয়ে মৃত মানুষের দল পৌঁছে যায় শহরে-গ্রামে-গঞ্জে। অফিসপাড়া থেকে সচিবালয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদরাসা। মাছের বাজার থেকে শপিংমল। গিজগিজ করে মৃত মানুষের দল। কেউ দশ বছর আগের। কেউ শত কিংবা হাজার বছর আগের। কেউবা তারও আগের পৃথিবীর বাসিন্দা।
কেউ মোবাইল দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়, কেউ গাড়ি দেখে চিৎকার দেয়। উন্মুক্ত পৃথিবীর প্রেমলীলা দেখে লজ্জায় চোখ ঘুরিয়ে নেয় কেউ। কেউ এআইর কর্মকাণ্ড দেখে হতবাক। কেউবা মানুষের মধ্যে কুকুরের আচরণ দেখে যারপরনাই বিস্মিত। মানুষ রক্ত চোষে মানুষের, চেটেপুটে খায় মানুষের রক্ত অর্থনৈতিকভাবে-রাজনৈতিকভাবে।
মানুষের পৃথিবীতে সব আছে অথচ কী যেন নেই কোথাও! মানুষের সর্বোচ্চ স্খলন দেখে ক্রমে ক্রমে মৃতদের ভেতর তৈরি হয় ঘৃণা। ক্রমাগত ঘৃণা পরিণত হয় ক্ষোভে। অতঃপর ক্ষোভ পরিণত হয় বিদ্রোহে। শুরু হয় ভাঙচুর, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে থাকে একের পর এক মানুষের গড়া সভ্যতা, মানুষের গড়া আধুনিক পৃথিবী। মানুষ সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও প্রতিহত করতে পারে না এই ধ্বংসযজ্ঞ।
এই অনাসৃষ্টি থেকে মুক্তি পেতে মৃতদের একদল নেতার সঙ্গে জীবিত দলের নেতারা বসে গোলটেবিল বৈঠকে। রুদ্ধদ্বার মিটিং। টানা তিন দিন, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, তিনরাত চলল মিটিং। মৃতরা টেবিল চাপড়ে বলল, যেহেতু আমরাও মানুষ তাই আবাসযোগ্য আমাদের পৃথিবী চাই তা ছাড়া আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখনও বসবাস করে পৃথিবীতে তাই পৃথিবীটা বাসযোগ্য দেখতে চাই আমরা এবং অবশ্যই।
মানসিক বৈকল্য তলানিতে ঠেকেছে মানুষের। মানুষের যে আদর্শ, মানবিক বোধ, সুস্থ-সুন্দর আর সৌন্দর্যবোধ একসময় মানুষের পরিচয় ছিল তা আজ আর নেই। উন্নত বিশ্ব চুষে খায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। মানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগের মারণাস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত মানুষেরই মেধা, মানুষকে পায়ের নিচে রাখতে সন্ত্রাসের, শাসনের, কৌশলের আশ্রয় নেয় মানুষই।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ সৃষ্টি করে বৈষম্য, দেশে-দেশে, মানুষে-মানুষে। মনুষ্যত্ব বলে যে শব্দটা ছিল অভিধানে তা আর নেই। ছুটছে সবাই আকাশের সর্বোচ্চ সীমাকে লক্ষ্য করে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অনতিবিলম্বে ধ্বংস হবে এই সুন্দর পৃথিবী। এই কথাগুলো জীবিতরা না বুঝলেও বুঝেছিল মৃতরা, তাই এই বহু দফা দাবি।
জীবিত মানুষরা মেনে নিল মৃতদের সব দাবি। মৃতরা মিলিয়ে গেল আঁধারে, যেভাবে এসেছিল সেভাবেই। জীবিতরা মৃতদের কোনো কথাই রাখেনি। তেমনই পৃথিবীর জীবিতরা ছুটে চলল উলঙ্গ আভিজাত্যে আগের মতো, আগের নিয়মেই।
বহু বছর পরের কথা। পৃথিবী তখন উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে। অত্যাধুনিক পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে এক দল মেধাসম্পন্ন যন্ত্র, অফিস-আদালতের ডিসিশন মেকারও তারা। বিনিয়োগ হচ্ছে। ফ্যাক্টরি চলছে। গাড়ি চলছে। রকেট ছুটছে সূর্যকে লক্ষ্য করে। একজন মৃত মানুষ ভাঙা একটা কবরের মাটি সরিয়ে উঠে এলো ব্যস্ত পৃথিবীতে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল সে সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। রোবটগুলো কাজ করছে নিজের মেধায়। মৃত মানুষটা বিস্মিত চোখে হতবাক হয়ে তাকায়। সবকিছুই স্বাভাবিক আর সত্যি সত্যিই অভিধানের পাতায় জ্বলজ্বলে হরফে লেখা আছে এককালে পৃথিবীতে মানুষ নামের একদল পশু বাস করত, মনুষ্যত্ব শব্দটা সেখান থেকে পাওয়া, যে শব্দের ব্যবহার তখন ছিল না তবে এখন আছে।
মনুষ্যবিহীন আজ পৃথিবী। কোথাও কোনো মানুষ নেই।
সময়ের আলো/এআর