বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তম দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই দলটিকে। অথচ একসময়ে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ‘বন্ধুত্বের পথে’ হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত বড় ধরনের সাফল্য পেতে পারে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ছাত্ররাজনীতিতে দলটির প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এখন জামায়াতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। তাই জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এমন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এ ধরনের প্রচেষ্টাকে দেশের রাজনীতির জন্য ভয়ংকর অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকেরই মনে প্রশ্ন উঠেছে- তা হলে কি আগামীতে জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখছে আমেরিকা? বিষয়টা কি আসলেই তাই? এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা নানা মত প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, বাংলাদেশে শাসনক্ষমতায় জামায়াতকে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র- এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল। বরং দেশে জামায়াত কিংবা ইসলামপন্থী দলগুলোকে ঘিরে এক ধরনের নতুন করে ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। আর বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থী দলে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবে বিভিন্ন দেশ কিংবা দলের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে পারে। বাংলাদেশের সব দলের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ রয়েছে। কেউ সরাসরি, কেউ ইনডাইরেক্টলি (পরোক্ষভাবে)। যেমনটি বাংলাদেশের অনেকে দলের সঙ্গে ভারত কিংবা চীনও বৈঠক করে থাকে। তার মানে বিষয়টা এমন নয় যে, তারা জামায়াতকে ক্ষমতায় আনছে। তাই এটা নতুন কোনো ইস্যু নয় এবং বিষয়টি এত বড় করে দেখার কোনো সুযোগও নেই। যে-ই ক্ষমতায় আসুক, যদি সে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসে, যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে কাজ করবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় বিশ্বের অনেক দেশই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়ে নানাভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে কে ক্ষমতায় আসছে কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে পারে- তা নিয়ে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে।
সেসব দলের সঙ্গে অনেকেই নতুন করে সম্পর্ক গড়তে এগিয়ে আসতে চায়। ফলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে জামায়াত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে চায়- এমন খবরের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। আর এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কিছু নয়। এমন প্রতিবেদনের সত্যতা থাকতে পারে। আবার নাও থাকতে পারে। আবার এটা লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমেও করাতে পারে জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দল। সেটি আওয়ামী লীগও করাতে পারে- জামায়াততে বেকায়দায় ফেলতে। তবে জামায়াতের লবিং কিংবা বহির্বিশ্বের যোগাযোগ অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ভাল। তারা এ ধরনের লবিং নিয়োগের মাধ্যমেও এ ধরনের প্রতিবেদন করাতে পারে। যাতে করে নির্বাচনে একটা প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। পুরো জাতি এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। সুতরাং আমরা যদি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারি এবং জনগণ যদি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। তা হলে জনগণ যাকে ভোট দেবে, সেই দলই ক্ষমতায় আসবে। মূল কথা হলো- যড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার আসার দিন শেষ। ফলে জনগণের ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসতে হবে। আর এই নিয়ে কে কি বলল কিংবা প্রতিবেদন তৈরি করল তা দেখার বিষয় নয়। তবে এটা সত্য যে, বর্তমান জামায়াত তাদের কার্যক্রম অনেকটাই মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। ফলে আমার মনে হয়- এবারের ভোটে জামায়াত লাভবান হবে এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তারা যতটুকু মডারেট করা সম্ভব সেটাও তারা করেছে। জামায়াতের যে গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে- এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।
জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায় যুক্তরাষ্ট্র- ওয়াশিংটন পোস্টের এমন প্রতিবেদনের বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। এটাকে অনেকে এভাবে বলছেন যে, আমেরিকা দেখছে জামায়াত ক্ষমতায় আসছে। বিষয়টা কি আসলেই তাই? বিষয়টা মূলত এতটা সহজ নয়। এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে জামায়াতের অ্যাক্টিভিস্টরা নতুন করে ন্যারেটিভ তৈরি করছে। তারা বিষয়টি এমনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে যাতে মনে করা হয়- জামায়াত ক্ষমতায় আসছে। তবে এটা সত্যি জামায়াতের নেতারা ওয়াশিংটন গিয়ে বেশ কয়েকবার মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জামায়াতের নেতারা তো ভারতের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। আর জামায়াতের এটা অভ্যাস হলো- তারা কানে কানে কথা বলেন।
তিনি বলেন, নাইন ইলেভেনের পর মাঝখানে জামায়তের সঙ্গে আমেরিকার যোগাযোগের কিছুটা ঘাটতি হয়েছিল। যখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে। এমনকি বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের কারণে দীর্ঘদিন বিএনপিকে কোণঠাসা থাকতে হয়েছে। আমেরিকা অনেক আগে থেকেই মুসলিম দেশগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই পেট্রোনাইজ মানে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। ফলে জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের অবর্তমানে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে উঠছে। তারা আগের চেয়ে বেশি আসন পাবে- এটা একটা ফ্যাক্ট। ফলে ক্ষমতায় যাবে বলে যোগাযোগ করছে বিষয়টা তা নয়। একই সঙ্গে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে- কোনোভাবেই বাংলাদেশে জামায়াত শরিয়াহভিক্তিক আইন কায়েম করতে দেবে না। তার মানে বিষয়টা হলো- যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে পরাশক্তি, তার কাজই হলো বিভিন্ন দলের সঙ্গে এনগেইজড থাকা। যাতে করে সে যেকোনো সময় দলের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে পারে। আর যে দল শক্তিশালী হয়ে উঠছে সে দলের সঙ্গে অনেক দেশই বসবে। এটা খুব সিম্পল বিষয়। এটা নিয়ে হাইপ বানিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করছে। জামায়াত তথ্যকে বিকৃত করে নানাভাবে উপস্থাপন করছে। এটাও রাজনীতিতে এক ধরনের দেউলিয়াত্বপনা।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইছে-এটি আনন্দেরও নয়, আবার উদ্বেগেরও কোনো খবর নয়। জামায়াতের সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশেরই স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ও সম্পর্ক আছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিষয়।
অডিও রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা পুনরুত্থিত ‘ইসলামপন্থী আন্দোলনের’ সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ। গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে’। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ‘আগের চেয়ে ভালো করবে’। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।’ নিরাপত্তার কারণে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। জামায়াত বাংলাদেশে ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা জোর করে প্রয়োগের চেষ্টা করবে- এমন উদ্বেগকে তিনি খাটো করে দেখছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের কাছে এমন সুবিধা রয়েছে, যা তারা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে, জামায়াত শরিয়াহ আরোপ করতে পারে।’ আর দলটির নেতারা যদি উদ্বেগজনক পদক্ষেপ নেন, তা হলে কী হবে- এমন প্রশ্নে ওই কূটনীতিক বলেন, এমনটা করলে যুক্তরাষ্ট্র ‘পরদিন তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কট্টর অবস্থান নিলে, ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে।
প্রতিবেদনের বিবৃতিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি বলেন, ডিসেম্বরে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা ছিল নিয়মিত আলোচনা। এটা মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে রেকর্ডবিহীনভাবে হয়েছে। তিনি বলেন, বৈঠকে অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক দলকে অন্য দলের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় না। বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে সরকারই হোক না কেন, তার সঙ্গে কাজের পরিকল্পনা (ওয়াশিংটনের) রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে করা মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমরা মন্তব্য না করার সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি বলেন, জামায়াত ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন’-এর প্ল্যাটফর্মে চলছে। নারীদের জন্য কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনও ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’। শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা দলের নেই।
এএডি/