স্বস্তিতে দেশীয় এয়ারলাইন্স

রফিক রাফি

দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাড়া দিয়ে বিমানবন্দর ব্যবহারের বকেয়া পাওনার ওপর সারচার্জ কমিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বার্ষিক সারচার্জের হার আগের

2026-01-24T01:21:54+00:00
2026-01-24T01:26:23+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
স্বস্তিতে দেশীয় এয়ারলাইন্স
১৪ শতাংশে নামল সারচার্জ
রফিক রাফি
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২১ এএম  আপডেট: ২৪.০১.২০২৬ ১:২৬ এএম
সংগৃহীত ছবি
দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাড়া দিয়ে বিমানবন্দর ব্যবহারের বকেয়া পাওনার ওপর সারচার্জ কমিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বার্ষিক সারচার্জের হার আগের ৭২ শতাংশ থেকে অনেকটা কমিয়ে ১৪.২৫ শতাংশ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বছরের পর বছর ধরে বোঝা হয়ে থাকা বিশাল আর্থিক চাপের অবসান ঘটল। অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো বলছে, এই পদক্ষেপের ফলে এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূর হলো। এই সিদ্ধান্ত এ খাতে স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছে। এ জন্য বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানান তারা। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে ভাড়া কমার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন তারা।

বেসরকারি মালিকানাধীন বিমান সংস্থাগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম, অ্যাভিয়েশন অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (অঙঅই) দীর্ঘমেয়াদি অনুরোধের পর এই পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে প্রতিযোগিতা ও সেবার মান বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবেন যাত্রীরা।

তথ্যানুযায়ী- বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সারচার্জ হার আঞ্চলিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি ছিল, ভারতে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ, ওমানে ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে প্রায় ২ শতাংশ। গত নভেম্বরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে গেজেট জারি করলেও গত সপ্তাহে এটি প্রকাশিত হয়।

সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে, দেশের ৮টি বিমানবন্দরে ল্যান্ডিং, এয়ার নেভিগেশন, পার্কিং, এমবার্কেশন, রানওয়েতে ব্যবহার, কন্ট্রোল রুম সেবা ও টার্মিনাল ব্যবহারের মতো বিভিন্ন সেবার ওপর এই চার্জ আদায় করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এটাকে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বা বিমান চলাচলসংক্রান্ত ফি বলা হয়। এই ফি পরিশোধে বিলম্বের জন্য বার্ষিক সারচার্জের হার আগের ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে। গত নভেম্বরের শেষের দিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এখন থেকে বিল জমা দেওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করলে এয়ারলাইন্সগুলোকে কোনো সারচার্জ দিতে হবে না। যদি এই সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা না হয় তবে পরবর্তী ৩০ দিনের জন্য ১ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।

৬১ থেকে ১২০ দিন বিলম্ব হলে ১.২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হবে। আর এরপর প্রতি ১২০ দিন বা তার অংশের জন্য ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রযোজ্য হবে, যতক্ষণ না সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা না হয়। এর আগে সিভিল অ্যাভিয়েশন রুলস ১৯৮৪ অনুযায়ী, বকেয়া বিলের ওপর এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি মাসে ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হতো। অর্থাৎ, এক বছর দেরি হলে সারচার্জের পরিমাণ দাঁড়াত মূল অর্থের ৭২ শতাংশে, যা আর্থিক পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব করে তুলত।

বেবিচকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৫১.৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকাই সারচার্জ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচটি এয়ারলাইন্স- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে এই পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে।

সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় আছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তাদের একারই বকেয়া ৬ হাজার ৬৮.৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৭৯৪.১৩ কোটি টাকাই হলো সারচার্জ, যেখানে মূল বিলের পরিমাণ মাত্র ৭৪৫.৫২ কোটি টাকা। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে- তাদের মোট দায়ের সিংহভাগই হলো সারচার্জ। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইন্স ইতিমধ্যেই তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

অ্যাভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করবে এবং অতীতের মতো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। এমন একসময় এ সিদ্ধান্ত এলো, যখন ঋণের বোঝা ও পুঞ্জীভূত সারচার্জের কারণে অন্তত তিনটি দেশীয় এয়ারলাইন্স তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

তারা বলছেন, বিদেশি এয়ারলাইন্সের তুলনায় স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলো বেশি কাঠামোগত অসুবিধার সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর বিমানগুলোকে ২৪ ঘণ্টাই ঢাকায় অবস্থান করতে হয়। এর ফলে তাদের ‘গ্রাউন্ড টাইম’ বেশি হয় এবং বিমানবন্দরের সুবিধাগুলোও বেশি ব্যবহার করতে হয়। 

অন্যদিকে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত একটি ফ্লাইট পরিচালনা করে এবং এক-দুই ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে যায়। ফলে সারচার্জের খড়গ দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর ওপরই তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। এখন এই সিদ্ধান্তের কারণে সেবা উন্নত করার দিকে নজর দেবে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো।

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইন্স অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এই পদক্ষেপ অ্যাভিয়েশন সেক্টরের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। সারচার্জ কমানোর ফলে বাড়তি চাপ দূর হবে এবং ভবিষ্যতে পরিচালনা ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।

সিদ্ধান্তটিকে এ খাতের জন্য ‘বড় স্বস্তি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর আর্থিক সক্ষমতা জোরদার করবে, পাশাপাশি সেবার মান উন্নত করবে এবং যাত্রীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই হ্রাসকৃত সারচার্জ আগের বকেয়ার ক্ষেত্রেও (ভূতাপেক্ষভাবে) কার্যকর হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেন মফিজুর রহমান। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র মো. কামরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, সারচার্জ কমানোর ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর সাসটেইনিবিলিটি বাড়ল। বন্ধ হওয়ার যে প্রবণতা ছিল, সেটা না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। আগে যতগুলো এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়েছে তার মূল কারণ হচ্ছে- সারচার্জ সময়মতো পে করতে না পারার ফলে দেনার বোঝা বেড়ে যাওয়া।

তিনি বলেন, বন্ধ হওয়া প্রতিটি এয়ারলাইন্সের কাছেই ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। বিমানের কাছে পাওনা ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ওপরে সারচার্জ। বিগত সব সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বিফল হলেও এই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাই। এটা এই খাতের জন্য খুবই ইতিবাচক। 

তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের কারণে ভাড়া কমবে না। এটার সঙ্গে এয়ারলাইন্স টিকে থাকার সম্পর্ক। কোম্পানি টিকে থাকলে লাভ-লসের যায়গাটা তৈরি হবে। রেগুলেটরি অথরিটি খালি বলে এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে টাকা পায়। এটা আমাদের জন্য ডিসক্রেডিট। এখন সেটা বলার আর সুযোগ বিমান সংস্থাগুলো দেবে না বলেও মনে করেন তিনি।

কামরুল বলেন, ইউএস-বাংলা যদিও সবসময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাওনা পরিশোধে নিয়মিত থাকার চেষ্টা করেছে, তবু তিনি মনে করেন আগের সারচার্জ কাঠামো টিকে থাকার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর হুমকি ছিল। এয়ারলাইন্স যদি টিকে থাকতে পারে এবং আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকে, তা হলে শেষ পর্যন্ত তার সুফল গ্রাহকরাই পাবেন।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এই অস্বাভাবিক সারচার্জ এয়ারলাইন্সগুলোকে এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছিল। অতিরিক্ত সারচার্জের কারণে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নেন।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, বেবিচককে বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কমপক্ষে তিন থেকে চারটি বিমান সংস্থা তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ-

বর্তমানে বিলুপ্ত জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছে ৩৬৮.২৯ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে : মূল পরিমাণ ৫৬.৯৮ কোটি টাকা এবং ৩১১.৩০ কোটি টাকা সারচার্জ এবং অন্যান্য চার্জ। 

বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে ঈঅঅই-এর পাওনা ৩৫৫.৩৭ কোটি টাকা : মূল পরিমাণ ৫৬.৮৮ কোটি টাকা এবং বাকি ২৯৮.৪৯ কোটি টাকা জমানো সারচার্জ।

বন্ধ হয়ে যাওয়া রিজেন্ট এয়ারেরও পাওনা ২৮৩.৩৮ কোটি টাকা : মূল পরিমাণ ১৩৬.১৮ কোটি টাকা এবং বাকি ১৪৭.২০ কোটি টাকা বিলম্ব ফি।

খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বিমান সংস্থাগুলো টিকে থাকতে পারে এবং আর্থিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে তবে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হবে দেশ ও যাত্রীরা।

এএডি/


  বিষয়:   এয়ারলাইন্স 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: