বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামনে এখন আর প্রতিপক্ষ কোনো দল নয় বরং সবচেয়ে বড় বাধা অনিশ্চয়তা। সপ্তাহ দুয়েক পরই শুরু হওয়ার কথা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, অথচ সেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। নিরাপত্তাঝুঁকির কথা সামনে এনে সরকার ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি আইসিসি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর বাস্তব আশঙ্কার মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। মাঠের লড়াই নয়, এবার ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে বোর্ডরুম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।
রাজনীতিতে জড়িয়ে দেশছাড়া সাকিব আল হাসানকে ছাড়া এটি এমনিতেই ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অধ্যায়। তরুণদের কাঁধে ভর করে নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখছিল দেশের ক্রিকেট। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা। বিশ্বকাপে আদৌ মাঠে নামবে কি না বাংলাদেশ, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত সফরে যাচ্ছে না বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বিসিবি ও জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সরকারের এই অবস্থান কার্যত চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।
বড় আর্থিক ধাক্কার শঙ্কা : বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ালে তাৎক্ষণিক সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান ক্ষতি হবে আর্থিকভাবে। আইসিসির বৈশ্বিক ইভেন্টগুলো বিসিবি ও ক্রিকেটারদের আয়ের বড় উৎস। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলেই বিসিবি ও সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার মতো অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, যা প্রায় তিন লাখ মার্কিন ডলারের সমান। এ ছাড়া সেরা ১২ দলের মধ্যে থাকলে পাওয়া যেত সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি টাকা। বিশ্বকাপ না খেললে এই পুরো অঙ্ক থেকেই বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস ও সম্ভাব্য প্রাইজমানির সুযোগ হারিয়ে ব্যক্তিগত আয়ে বড় ধাক্কা আসবে। একটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেই যেখানে একজন ক্রিকেটার ন্যূনতম আড়াই লাখ টাকা পান, সেখানে একাধিক ম্যাচ না খেলার অর্থ সরাসরি ক্ষতি।
বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপ আয়ের ক্ষেত্রেও বিসিবির জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আইসিসি থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ ডলার অংশগ্রহণ ফি পাওয়ার কথা থাকলেও সেটিও আর পাওয়া যাবে না। বিশ্বকাপের মতো লাভজনক আসরে না খেললে সম্প্রচার ও ব্র্যান্ড ভ্যালুতে নেতিবাচক প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের সাবেক এক অধিনায়ক সময়ের আলোকে বলেন, অনিশ্চয়তার কারণে স্পন্সররা পিছিয়ে যেতে পারে এবং বিসিবির সামনে বড় আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে। তার মতে, এর প্রভাব শুধু একটি টুর্নামেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের তুলনায় এবার প্রাইজমানি ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে আইসিসি। এদিক বিচারে আর্থিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষতিটা আসলে বেশ বড়ই। যেমন শুধু গ্রুপপর্বে ও সুপার এইটে প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য ৩১ হাজার ১৫৪ ডলার বোনাস পাবে প্রতিটি দল। পঞ্চম থেকে ১২তম স্থানীয় প্রতিটি দল পাবে সাড়ে ৪ লাখ ডলার করে। সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দল পাবে ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার করে। রানার্সআপ ১৬ লাখ ডলার এবং চ্যাম্পিয়ন দল ৩০ লাখ ডলার প্রাইজমানি পাবে। এ ছাড়া এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার গ্রহণযোগ্য কারণ বাংলাদেশ যদি আইসিসির কাছে তুলে ধরতে না পারে তা হলে বিসিবিকে প্রায় ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা) জরিমানা গুনতে হতে পারে।
আইসিসির বর্তমান রাজস্ব বণ্টন নীতি অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৭ চক্রে বছরপ্রতি ৩২৭ কোটি টাকা করে পাওয়ার কথা বিসিবির। যেহেতু আইসিসির ডাকে সাড়া না দিয়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে না, তাই ২০২৮ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য রাজস্ব বণ্টন নীতিতে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে আইসিসি। পাশাপাশি আইসিসির বিভিন্ন কমিটি থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতিনিধিরা বাদ পড়তে পারেন। ভোটাধিকারও করা হতে পারে সীমিত।
একঘরে হওয়ার আশঙ্কা : বিশ্বকাপে অংশ না নিলে ভবিষ্যৎ আইসিসি ইভেন্টে বাংলাদেশের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। র্যাঙ্কিংয়ে প্রভাব পড়বে, আবার বাছাইপর্ব খেলতে হতে পারে। এতে বিশ্বমঞ্চে ফেরার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ওই সাবেক অধিনায়ক বলেন, চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলার সুযোগ হারালে খেলোয়াড়দের র্যাঙ্কিং ও ক্যারিয়ার দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁঁকিও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খেলোয়াড়রা : এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় শিকার ক্রিকেটাররাই। বর্তমান স্কোয়াডের অনেকের জন্য এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ। পারভেজ হোসেন ইমন বা সাইফ হাসানের মতো ক্রিকেটারদের জন্য এই পরিস্থিতি সরাসরি স্বপ্নভঙ্গের নামান্তর। বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ সীমিত। ফলে বিশ্বকাপই ছিল নিজেদের প্রমাণের বড় মঞ্চ। সেই দরজা বন্ধ হলে অভিজ্ঞতা ও ক্যারিয়ার নিরাপত্তা দুটিই হুমকির মুখে পড়বে।
রাজনীতি কি ক্রিকেটকে ছাপিয়ে গেল? : এই পুরো সংকটে রাজনীতির প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন ক্রিকেটেও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে। নিরাপত্তা ইস্যুতে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্নও উঠছে। অতীতে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড পাকিস্তান সফর বাতিল করলে আইসিসি তা মেনে নিয়েছে। তা হলে বাংলাদেশ একই যুক্তি দিলে প্রশ্ন উঠছে কেন- এই বিতর্ক এখন বিশ্ব ক্রিকেট রাজনীতির ন্যায্যতাকেই সামনে এনেছে।
ক্রিকেটকে সামনে ফেরানোর সময় : বাংলাদেশ ক্রিকেট বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই আজকের জায়গায় এসেছে। মাশরাফী, সাকিব, মুশফিক ও তামিমরা দেখিয়েছেন, এই দেশ বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরি করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা সেই অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ একটাই- ক্রিকেটকে রাজনীতি ও প্রশাসনিক টানাপড়েনের বাইরে এনে সামনে রাখা। না হলে ক্ষতি হবে শুধু একটি বিশ্বকাপের নয়, পুরো প্রজন্মের ক্রিকেট স্বপ্নের।
এএডি/