ভোটযুদ্ধে ভার্চুয়াল ছায়া

এম মামুন হোসেন

একসময় নির্বাচনি প্রচার মানেই ছিল পোস্টার, মাইকিং, পথসভা আর জনসভা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই চিত্র বদলে

2026-01-25T01:03:17+00:00
2026-01-25T01:03:17+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ভোটযুদ্ধে ভার্চুয়াল ছায়া
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:০৩ এএম 
প্রতীকী ছবি
একসময় নির্বাচনি প্রচার মানেই ছিল পোস্টার, মাইকিং, পথসভা আর জনসভা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই চিত্র বদলে গেছে। রাজপথের পাশাপাশি এখন ভার্চুয়াল জগৎও হয়ে উঠেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি মাঠ। নির্বাচনি আচরণবিধি, জনসমাবেশের সীমাবদ্ধতা ও তরুণ ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রার্থীরা ঝুঁকছেন অনলাইন প্রচারে। তারা সরাসরি চলে এসেছেন সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক সবখানেই চলছে ভোটের লড়াই। পোস্টার ছাপার খরচের বদলে এখন বাজেট যাচ্ছে ডিজিটাল কনটেন্টে ভিডিও বার্তা, লাইভ অনুষ্ঠান, ইনফোগ্রাফিক, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি পোস্টারেও।

একই সঙ্গে আধুনিক প্রচারের সমান্তরালে এক নতুন ও ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর অপব্যবহার। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ ভিডিও, এআই-জেনারেটেড প্রপাগান্ডা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এখন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ট্রোল, গুজব ও ফ্যাক্টচেকের যুদ্ধ চলছে ভার্চুয়াল জগতে। খোদ নির্বাচন কমিশনও এ উদীয়মান প্রযুক্তিগত ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে সব প্রার্থী ব্যস্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। দেশের সবচেয়ে বড় ভার্চুয়াল প্রচার প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত পেজ, দলীয় পেজ, সমর্থকদের গ্রুপ সব মিলিয়ে ফেসবুক যেন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান মঞ্চ। কেউ উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন, কেউ আবার প্রতিপক্ষের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। লাইভে এসে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাও এখন নিয়মিত চর্চা। কদর বেড়েছে ফ্যান-ফলোয়ার বেশি পেজের। ইউটিউব, টিকটক আর শর্ট ভিডিও উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতিতে। দীর্ঘ বক্তব্যের জায়গা দখল করছে এক মিনিটের ভিডিও। টিকটক ও ইউটিউব শর্টসে নেতাদের বক্তব্য, স্লোগান, এমনকি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে মুহূর্তেই। এতে তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও।

ভার্চুয়াল মাঠের বড় চ্যালেঞ্জ গুজব ও অপপ্রচার। ভুয়া স্ক্রিনশট, কাটছাঁট করা ভিডিও, পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়ানো সবই দেখা যাচ্ছে। আবার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, টিভি স্ক্রল বা নিউজ পোর্টালের ডিজাইনের আদলে ভুয়া গ্রাফিক্স বানানো; মনগড়া সংখ্যা বা পরিসংখ্যান ব্যবহার; স্ক্রিনশট বা নথি জাল করা এবং একই মিথ্যা তথ্য একযোগে বহু পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সমন্বিত অপপ্রচারের ঘটনাও ঘটছে। ফেসবুকের ভুয়া ফটোকার্ডের সূত্র ধরে আলোচনার বাজার জমানো হচ্ছে, যা আমলে নিয়ে মূল ধারার কিছু সংবাদমাধ্যমও কখনো কখনো খবর প্রকাশ করছে।

একদিকে ট্রল সক্রিয়, অন্যদিকে ফ্যাক্টচেকার ও সচেতন নাগরিকরা চেষ্টা করছেন সত্য তুলে ধরতে। এ লড়াইয়ে সাধারণ ভোটারই হয়ে উঠছেন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের বড় অংশই রাজনৈতিক তথ্য পাচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। তারা পোস্ট দেখছেন, ভিডিও শেয়ার করছেন, মন্তব্যে মত দিচ্ছেন। ফলে ভার্চুয়াল জগৎ শুধু প্রচার জায়গা নয়, মত গঠনেরও বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভার্চুয়াল জগৎ আর বিকল্প নয়, এটি সমান্তরাল এক নির্বাচনি মাঠ। এখানে যেমন সুযোগ আছে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানোর, তেমনি ঝুঁকি আছে বিভ্রান্তি ছড়ানোর। শেষ পর্যন্ত এ ভার্চুয়াল লড়াই কতটা প্রভাব ফেলবে ব্যালট বাক্সে, তার উত্তর মিলবে ভোটের দিনই।

অনলাইন প্রচার নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনও সতর্ক। আচরণবিধি লঙ্ঘন, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়ালে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, বিশাল এ ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নজরদারি কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, এখন তো এআইয়ের যুগ। এআই নিয়ে একদম প্রথম থেকেই আমি শঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলাম যে এটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা হবে আমাদের জন্য বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ।
ফ্যাক্টচেকার, বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়াতে ডিপফেক ও চিপফেকের মতো ১০টি কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা ভিন্ন অর্থবাহী ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া; সত্য বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে বা প্রসঙ্গ বদলে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা; সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া; পুরোনো ছবি, ভিডিও বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা তত বাড়ছে। এ পর্যন্ত একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও আলোচিত অন্তত ১৩ নেতা-নেত্রী এমন ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।

দেশে গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিথ্যা তথ্যের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ২৯ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব। আটটি স্থানীয় তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ভিডিও; মোট তথ্য যাচাইয়ের ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। আগের তিন মাসের (এপ্রিল-জুন ২০২৫) তুলনায় গ্রাফিক্স, ছবি ও লিখিত পোস্টের ব্যবহার কমেছে, অর্থাৎ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার তৈরি ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হারও বাড়ছে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৬টি অপতথ্যই ছিল রাজনৈতিক। আবার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য, যার সংখ্যা ৬৫১টি। এরপর তথ্যভিত্তিক ভুল তথ্য রয়েছে ৫৫০টি আর ছবিভিত্তিক ভুল তথ্য ২৪৫টি। প্রকৃতির দিক থেকে এগুলোর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ছিল ১ হাজার ৫১টি, বিকৃত তথ্য ২৫৩টি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ১৩২টি, আংশিক মিথ্যা ৩টি ও আংশিক সত্য ২টি। এতে বোঝা যায়, যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরাসরি মিথ্যাই এ সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার ছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনে না থাকলেও অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোতে বড় ঝুঁকি তৈরি করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলটির নেতাকর্মীরা টেলিগ্রামসহ অনলাইনে যোগাযোগের নানা মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে বিভিন্ন অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো এমন শতাধিক পেজ ও গ্রুপ শনাক্ত করেছে।

এ বিষয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউআইইউ) সহযোগী অধ্যাপক এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা সময়ের আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচন আর শুধু পোস্টার-জনসভায় সীমাবদ্ধ নয়। ভার্চুয়াল জগতেই এখন মূল লড়াই যেখানে ডেটা, অ্যালগরিদম আর সচেতন নাগরিক আচরণই ভোটের ফল নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, ভোট যত ঘনিয়ে আসে, অপপ্রচার তত আক্রমণাত্মক হয়। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক মনিটরিং এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়িয়ে নাগরিকদের সচেতনতা করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর সময়ের আলোকে বলেন, প্রার্থীরা ঝুঁকছেন অনলাইন প্রচারে। এবার নির্বাচনি আচরণবিধি, জনসমাবেশের সীমাবদ্ধতা ও তরুণ ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। সব মিলিয়ে ভার্চুয়াল জগৎ আরেক নির্বাচনি মাঠ। আর ভার্চুয়াল জগৎ বিবেচনা নিয়েই নির্বাচনি বৈতরণী পার করতে হবে।

/এমএইচআর 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: