আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুর্নীতি ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে তেমন কোনো জোর নেই। বরং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অপব্যহার করে বিভিন্ন মহল দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রয়েছে। এটি আসলে উদ্বেগ ও হতাশাজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, আমরা এমন অবস্থায় আছি যে ৫৪ বছর, বিশেষ করে গত ১৫ বছরের যে জঞ্জাল, সেটি কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশে সুশাসিত, গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটা চট করে জাদুর কাঠি দিয়ে সম্ভব নয়। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে এখন একটা সুযোগটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলো কতটা নেবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার বা আলোচনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো কথা নেই, যা সত্যিই হতাশাজনক। ৫ আগস্টের পর ক্ষমতার বদল হলেও চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দলীয়করণের মাধ্যমে দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। লোক পাল্টেছে, ভোল পাল্টেছে। কিন্তু দুর্নীতি রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো কথা নেই। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেট ব্যবসা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সঙ্গত কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার বা আলোচনায় দুর্নীতির ভয়াবহতা এবং তা প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি রোধ করা বা কমানো যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমনটি লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও এখন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেনি। তাই তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করলে বোঝা যাবে, তারা কী আদৌ দুর্নীতি নির্মূল করতে চায় কি না। জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের জন আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সুশাসিত, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের গড়ার অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ও নতুন সরকার গঠনের পর এর কার্যকর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে প্রস্তাব রাখা উচিত। ৫ আগস্টের পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সোচ্চার হওয়ার কথা ছিল। সেটি কিন্তু আমাদের চোখে পড়েনি।
এমনকি এখনও দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেনি। তবে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যতীত কোনো ধরনের সংস্কার উদ্যোগ কার্যকর ও টেকসই হবে না বিধায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশমালা গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়নে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অঙ্গীকার করতে হবে। সংবিধান সংশোধন করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি দলগুলোর ইশতেহারে থাকা অত্যাবশ্যকীয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের পর পাঁচ বছর কীভাবে দুর্নীতি রোধে কি কি পদক্ষেপ নেবে তা কেউ বলেনি। যদিও দুয়েকটি দল তারা বক্তব্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন বলেছেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তারা দেয়নি।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে দুর্নীতি রোধে ১০টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ ১. সংবিধান সংশোধন করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা, ২. প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ৩. ‘দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবিরোধী দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্ট করা, ৪. জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদ অনুসারে বেসরকারি খাতের ঘুষ লেনদেনকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা, ৫. বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপ’-এর পক্ষভুক্ত হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা, ৬, জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি কার্যক্রমে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থতা, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব আইন’ প্রণয়ন করা, ৭. সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সদস্য ও কর্মীদের আয় ও সম্পদ বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ৮. বৈধ উৎসবিহীন আয়কে বৈধতা দানের যেকোনো রাষ্ট্রীয় চর্চা বন্ধ করা, ৯. অর্থ পাচার রোধে যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স) কার্যকর করা; অর্থ পাচার বন্ধ করতে বিএফআইইউ, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা; দেশে-বিদেশে সব আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘দ্য কমন রিপোটিং স্ট্যান্ডার্ডের (সিআরএস)’ মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের স্বয়ংক্রিয় তথ্য প্রাপ্তির সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা; ব্যক্তি খাতের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এবং খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার রোধে ‘সুবিধাভোগী মালিকানার স্বচ্ছতাবিষয়ক আইন (বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট)’ প্রণয়ন করা এবং ১০. দুর্নীতি প্রতিরোধে কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জনে প্রস্তাবিত দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় কৌশলপত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণ এবং এসব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকরতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ঘোষণা করছে না, তারা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করেন, বা রক্তে রঞ্জিত আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছেন, এমন বলার সুযোগ নেই। অবশ্য ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলো ঠিক ৫ আগস্ট ২০২৪ বিকাল থেকে শুরু করেই সারা দেশে যেভাবে দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, গ্রেফতার বাণিজ্যসহ আন্দোলনের বিজয়ী শক্তি হিসেবে দুর্নীতির মহোৎসবে লিপ্ত হয়েছে, তাতে ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা থাকা না থাকা যে অর্থহীন, তা-ও দেশবাসী হতাশ হয়ে দেখেছে। দলগুলোর মধ্যে সার্বিকভাবে, ‘এটি আমাদের পালা’ এই লক্ষণ দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। আবার এক অর্থে এটিও স্বাভাবিক যে, তাদের অনেকেই নির্বাচন করছেন জয়ী হয়ে জনরায়ে প্রাপ্ত ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে দুর্নীতির লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহারের জন্যই, যা থেকে এতদিন বঞ্চিত ছিলেন, এখন তা পুষিয়ে নেওয়ার সময়। আবার যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে দৃশ্যত রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করতে চাইছেন তারাও তো ট্রাকবোঝাই পাথর চুরির মতো ট্র্যাক রেকর্ডের সক্রিয় অংশীদার। এসবই হতাশাজনক, তবে মোটেও অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সময়ের আলোকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের কেবল প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। এখনও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেনি। তবে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও এনসিপি কিন্তু তাদের বক্তব্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও বেশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। আমরা সেটি এখনও লক্ষ্য করিনি। তারা নির্বাচনে বিজয়ী হলে আগামী পাঁচ বছর কীভাবে দেশ চালাবে তেমন কোনো রূপরেখা চোখে পরেনি। দুর্নীতি রোধে তাদের কী পরিকল্পনা সেটি এখনও তারা প্রকাশ করেনি। যেহেতু ইশতেহার ঘোষণা করেনি, তাই আমরা অপেক্ষা করছি, তারা কী বলে। তাই আগাম কিছু বলতে পারছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনটা ভিন্ন আঙ্গিকে হচ্ছে। ফলে নির্বাচনে অনেক কিছুই অনুপস্থিত রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রচার-প্রচারণা শুরু হলেও স্থানীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান তেমন কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। বরং নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতিতে জনগণের মনে বিভ্রান্ত বাড়ছে। এর আগে বিএনপি তাদের ২১ দফা দিয়েছিল। সেখানেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা ছিল। তবে দুর্নীতি রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোনো পরিকল্পনা দেখছি না। উন্নত দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চায় আমরা যেটি লক্ষ্য করি, সেটিও তাদের পরিকল্পনায় নেই। দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করছে। আগামী পাঁচ বছর কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেবে, এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। যেহেতু কেন্দ্র থেকে তেমন কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় পর্যায়েও যেসব প্রার্থীরা রয়েছেন, তাদের মধ্যেও দুর্নীতি রোধে তেমন কিছু নেই।
আমরা যেটিই লক্ষ্য করেছি, কোনো কোনো ব্যক্তি এলাকার উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ফলে ব্যক্তি থেকে উত্তরণ হয়নি। এমনকি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যে এখনও কিন্তু নির্বাচন নিয়ে জনমনে অনেক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না সেটি নিয়েও জনগণ ধোঁয়াশায়। অর্থাৎ পুরোনো ভোটের সংস্কার থেকে বের হতে পারিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী তরুণদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাসটা ছিল সেটিও এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যদিও তরুণরা বলছেন, নির্বাচিত হতে পারলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। কিন্তু দুর্নীতি রোধে কি কি পরিকল্পনা সেটি তারা বলেনি। পুরোনো সংস্কৃতির কারণেই এটি আসলে উত্তরণ সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে যে দুর্নীতি রাহুগ্রাস, তার স্বল্প সময়ে দমন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দুদকের পক্ষেও এই দুর্নীতিরোধ করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। তা হলে শুধু দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। ‘লোক পাল্টেছে ও ভোল পাল্টেছে’ এর বেশি কিছু না।