ইলেকট্রিক চুলায় ঝুঁকছে মানুষ
এলপি গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত শ্রীপুর
মেহেদী হাসান লিটন শ্রীপুর (গাজীপুর)
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:১৩ এএম
সংগৃহীত ছবিশিল্পাঞ্চল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কয়েক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জনপদে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব মানুষের অধিকাংশই ভাড়া বাসায় থেকে শিল্প-কারখানায় কাজ করেন এবং রান্নার জন্য পুরোপুরি এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পোশাক কারখানার শ্রমিক ও গৃহিণীরা। অনেক এলাকায় দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। কখনো কখনো বাড়তি দাম দিয়েও গ্যাস মিলছে না। স্থানীয়দের ভাষায়, গ্যাস পাওয়া এখন যেন সোনার হরিণ।
স্থানীয় এলপি গ্যাস ডিলাররা জানান, সরবরাহকারী কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার না পাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। পরিবহন সংকট ও কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সংকট কেটে যাবে বলে আশ্বাস দেন তারা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মাওনা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শান্তনু রায় বলেন, এলপি গ্যাস সংকটের কারণে মানুষ ব্যাপকভাবে ইলেকট্রিক চুলা, রাইস কুকারসহ নানা ডিভাইস ব্যবহার করছে। এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এমনিতেই কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান শান্তনু রায়।
এ প্রসঙ্গে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ব্যারিস্টার সজিব আহমেদ বলেন, এলপি গ্যাস সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে মাঠে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা বাড়তি দামে বিক্রির প্রমাণ পেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ব্যারিস্টার সজিব আহমেদ।
এলপি গ্যাস সংকটের ফলে বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। মাওনা চৌরাস্তার ব্যবসায়ী জাহিদ হাসান বাপ্পি বলেন, গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। এখন মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসছে। রাইস কুকারের বিক্রিও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
মাওনা চৌরাস্তার কিতাব আলী প্লাজা থেকে ইলেকট্রিক চুলা কিনতে আসা পোশাককর্মী শিশির আক্তার বলেন, গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। লাকড়ির চুলার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে ৫ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি।
সরেজমিন কথা হয় শ্রীপুর উপজেলা শহরের গৃহিণী শাহানাজ সিকদারের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, দোকানে গেলেই বলে গ্যাস নেই। যেখানে পাওয়া যায়, সেখানে দাম অনেক বেশি। রান্নাবান্না এখন খুব কষ্টকর হয়ে গেছে। সময়মতো কাজ করা যাচ্ছে না। মেয়েকে সকালে স্কুলে পাঠানোর আগে দ্রুত খাবার বানাতে হয়। গ্যাস না পেয়ে তিন তলা থেকে নেমে সিঁড়ির নিচে লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমার ছোট বাচ্চা আছে। শীতে নিয়মিত খাবার গরম করতে হয়, পানি গরম করতে হয়। মাসে অন্তত দুটি সিলিন্ডার লাগে। এই অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি একজন মধ্যবিত্ত হিসেবে কখনোই মেনে নেওয়া সম্ভব না।
পৌরসভার দক্ষিণ ভাংনাহাটী গ্রামের পোশাক শ্রমিক ফাতেমাতুজ জহুরা বলেন, ভোর ৫টায় উঠে রান্না করে কাজে যেতে হয়। গ্যাস না থাকলে সময়মতো রান্না সম্ভব হয় না। লাকড়ি দিয়ে রান্না করা খুব কষ্টকর।
সময়ের আলো/এনএ