ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। তবে নির্বাচনি মাঠে থাকলেও দলটির প্রচার কার্যক্রমে স্পষ্ট ভাটা দেখা যাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য রাজনৈতিক দল মাঠে-ময়দানে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে সক্রিয় থাকলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের প্রকাশ্য প্রচার তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
দলটির নেতারা বলছেন, মব আতঙ্ক, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক চাপের কারণে তারা প্রকাশ্যে কর্মসূচি দিতে পারছেন না।
জাতীয় পার্টির একাধিক প্রার্থী ও শীর্ষ নেতা অভিযোগ করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই দলটিকে পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা ও কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে।
সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একাধিক দফা সংলাপ হলেও সেখানে জাতীয় পার্টিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। একইভাবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধিত দল হিসেবে যোগাযোগের সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন নেতারা।
এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিলেও মাঠে সমান সুযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ জাতীয় পার্টির। দলটির ভাষ্য, গত ১৬ মাসে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার জন্য প্রশাসনিক ও সামাজিক নানা বাধা তৈরি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় পার্টিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে দলটির কার্যালয়ে হামলা, সভা-সমাবেশে বাধা এবং নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। রাজধানীর বিজয়নগরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। ২১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হলেও জাতীয় পার্টি বড় ধরনের সভা বা সমাবেশ করতে পারেনি।
বিপরীতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় সমাবেশ ও নির্বাচনি কর্মসূচি চালাচ্ছে। জাতীয় পার্টির নেতাদের অভিযোগ, তাদের প্রকাশ্যে কর্মসূচি করতে গেলে মব সৃষ্টি ও হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলেও এবার দলটি অনেকটা নীরব অবস্থানে রয়েছে। জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি এবার ২৪৩টি আসনে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মনোনয়ন পেয়েছেন ৩০ জন প্রার্থী। অথচ এ অঞ্চলেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রচারণা সবচেয়ে জোরালো। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট সম্প্রতি রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আট স্থানে সমাবেশ করে ৪০টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এসব আসনের অন্তত ৩০টিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও তাদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো বড় কর্মসূচি দেখা যায়নি।
রংপুর-৩ আসন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নিজ এলাকা। এখানেও তাকে সীমিত পরিসরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ চালাতে হচ্ছে।
গত রোববার রংপুর নগরীর সেনপাড়ায় নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকাশ্যে জনসভা ও সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, মব করার কথা বলা হচ্ছে। আমরা সমান সুযোগ পাচ্ছি না।’
জাতীয় পার্টি গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অংশ নেওয়ায় ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে সমালোচিত হয়ে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাবমূর্তি দলটির প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। বর্তমান নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে সেই নেতিবাচক ধারণাকে পুঁজি করে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে চাপ দিচ্ছে। সম্প্রতি নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র অধিকার পরিষদ জাতীয় পার্টির নিবন্ধন বাতিলের দাবিও জানিয়েছে।
তবে জাতীয় পার্টির নেতারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির সমালোচনা করেছেন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে কোনো অন্যায় হিসেবে দেখেন না।
গাইবান্ধা-৫ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘আমাদের সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। লাঙ্গল দেখলেই কারও কারও গায়ে জ্বালা ধরে। মবের ভয় দেখানো হচ্ছে। এটি কোনো স্বাভাবিক নির্বাচনি পরিবেশ হতে পারে না।’ যদিও তিনি গত শনিবার ফুলছড়ি বাজারে সীমিত আকারে গণসংযোগ করেন।
রংপুর-২ আসনের প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘বড় সভা করতে পারছি না, হুমকি পাচ্ছি। তবু মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।’
ঢাকা-১০ আসনের প্রার্থী বহ্নি বেপারী বলেন, ‘গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু মনের মধ্যে সবসময় আতঙ্ক কাজ করে। বড় সমাবেশ করার সাহস পাচ্ছি না।’
জাতীয় পার্টির নেতাদের মতে, এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবু দলটি সব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নির্বাচনি মাঠে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
এফআর