রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ভয়ংকর জনপদে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর। অথচ শহরের কাছেই এর অবস্থান। পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটি। একের পর এক প্রশাসনের অভিযানে হামলা, সরকারি কর্মকর্তাদের গণপিটুনি, অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্য— সবকিছুকে ছাপিয়ে সবশেষ র্যাবের এক কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এই নৃশংস ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও ঘটনার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এর মধ্যেই র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াছিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ঝামেলা করলে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে নিজের কার্যালয়ে বসে তার দেওয়া ২৯ মিনিটের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বক্তব্যে সন্ত্রাসী নন দাবি করে তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জায়গা আমাদের ক্রয় করা সম্পত্তি। সেখান থেকে আমাদের কেউ উচ্ছেদ করতে পারবে না। এর আগে সাবেক এক জেলা প্রশাসক জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ করতে গিয়ে নিজেই উধাও হয়ে গেছেন।
রক্তাক্ত সলিমপুরে একের পর এক সংঘর্ষ ও প্রাণহানি : জঙ্গল সলিমপুরে সহিংসতা নতুন নয়। গত দেড় বছরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। এরপর ৪ অক্টোবর এক সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। স্থানীয় পুলিশের মতে, পাহাড়ি এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণই এসব হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।
প্রশাসনের ওপর ধারাবাহিক হামলা : র্যাব সদস্য হত্যার আগেও একাধিকবার প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে জঙ্গল সলিমপুরে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে র্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময় হয়। একই বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, জঙ্গল সলিমপুর কার্যত সন্ত্রাসীদের অঘোষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে।
কীভাবে গড়ে উঠল সন্ত্রাসীদের আখড়া : প্রায় তিন হাজার একর সরকারি খাসজমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল পাহাড়ি জনপদে বর্তমানে বসবাস করে প্রায় এক লাখ মানুষ। নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে তোলার মাধ্যমে এই এলাকার সূচনা করেন।
পরে তিনি র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার সহযোগীরা এলাকা ভাগ করে নেয়। রাজনৈতিক সমঝোতা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে একসময় মশিউর, গফুর ও ইয়াছিন নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির বলেন, ভোটের রাজনীতি ও জনসংখ্যার কারণে এলাকাটিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাচ্ছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
যৌথ অভিযানের ঘোষণা : চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল জানান, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি ভাঙতে না পারলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমানও জানিয়েছেন, শিগগিরই সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান শুরু হবে। লক্ষ্য— অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, সরকারি জমি উদ্ধার এবং র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।
এর আগে গত সোমবার চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালায় র্যাব-৭। অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাবের দুই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইয়াছিন তার সহযোগীদের নিয়ে সলিমপুরে একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছে এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযানের শুরুতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারদিক থেকে চার-পাঁচ শতাধিক লোক জড়ো করে র্যাব সদস্যদের ঘিরে ফেলে ইয়াছিনের বাহিনী।
চারজন র্যাব সদস্যকে একটি কার্যালয়ের ভেতরে আটকে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর তাদের বিবস্ত্র করে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এরপর সিএনজি অটোরিকশায় তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আলীনগরে নিয়ে গিয়ে একটি ঘরে আটকে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়। এই নির্যাতনের শিকার র্যাব সদস্যদের মধ্যে ছিলেন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
পরে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজনৈতিক কার্যালয় নিয়ে বিতর্ক ও সন্ত্রাসীদের দখলদারি : ঘটনার পর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জঙ্গল সলিমপুরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গত দেড় বছরে আমরা সেখানে কোনো কর্মসূচি পালন করিনি। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। তা ছাড়া সীতাকুণ্ডের জঙ্গল এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে র্যাব সদস্য নিহতের মর্মান্তিক ঘটনায় বিএনপির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নাম জড়িয়ে যেসব সংবাদ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য ভিন্ন।
সরেজমিন তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সন্ত্রাসী মশিউর ও গফুর মেম্বারের নিয়ন্ত্রণে যে ভবনটি আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা পালিয়ে গেলে উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বার সেটি দখল করেন এবং বিএনপির সাইনবোর্ড ঝোলান। পরবর্তীতে আলীনগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন ওই এলাকা দখলের চেষ্টা করলে রোকন ও ইয়াছিনের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। একসময় কার্যালয়টি ইয়াছিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
স্থানীয়রা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন শুধু একটি এলাকা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ।
র্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা প্রমাণ করেছে, সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই অভয়ারণ্য ভাঙতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত যৌথ অভিযান কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই পাহাড়ের আড়ালে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটাতে পারে।
এফআর