ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করতে সবাইকে একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ধানের শীষ প্রতীকের জন্য ভোট চেয়ে জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। উত্তরের জেলা ময়মনসিংহ অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও কৃষি খাতে বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী ভাতার বিষয়ে আবারও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। এ জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে জয়ী করতে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমান।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। সিলেটের নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর কড়া সমালোচনা করলেও ময়মনসিংহে তেমন সমালোচনায় যাননি তারেক রহমান। তবে তিনি বক্তব্যে বলেন, একটি রাজনৈতিক দল, যারা এখন পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তাদের দাবি- বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন হলো, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে ওই দলটিরও তো দুজন সদস্য (মন্ত্রী) ছিলেন। বিএনপি যদি এতই খারাপ হতো তবে তারা কেন তখন পদত্যাগ করে চলে আসেননি? যদিও বক্তব্যের মাঝে এ-ও বলেন, অন্য দলের সমালোচনা করলে জনগণের কোনো লাভ হবে না।
তারেক রহমান বলেন, একাত্তর সালের যুদ্ধই হোক, ২০২৪-এর আন্দোলনই হোক, কে পাহাড়ি মানুষ, কে সমতলের মানুষ, কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ এটি কিন্তু কেউ দেখেনি। রাজপথে সবাই পাশাপাশি আন্দোলন করেছে, একাত্তর সালে যুদ্ধে সবাই একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান, কে অন্য ধর্মের মানুষ কেউ দেখে নাই। এবারও ১২ তারিখে নির্বাচনে আমাদের সবাইকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ একসঙ্গে থাকতে হবে।
তারেক রহমান এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা যদি একসঙ্গে থাকি আমরা যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমরা যদি একসঙ্গে থাকি আমরা যেভাবে স্বৈরাচার বিদায় করেছি, আমরা যদি ইনশাআল্লাহ সামনের দিনে একসঙ্গে থাকি তা হলে অবশ্যই এই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যেতে পারব। সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হয় তাহলে সেøাগান হবে একটাই। সেটা হলো- করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার মনে রাখতে হবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুরের বিএনপি দলীয় ২৪ প্রার্থীকে ধানের শীষ হাতে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, আমি আপনাদের দায়িত্ব দিলাম, তাদের বিজয়ী করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।
সারা দেশে নির্বাচনি প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে তারেক রহমান দুপুরে সড়কপথে ময়মনসিংহ আসেন। সার্কিট হাউসের বিশাল মাঠে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর- এই চার জেলা থেকে নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছান সাড়ে ৩টায়। ভিড় ঠেলে তার গাড়িবহর সার্কিট হাউস মাঠে পৌঁছাতে নিরাপত্তাকর্মীদের বেগ পেতে হয়। বিকাল ৪টার দিকে মঞ্চে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে উঠেন তরেক রহমান। তবে জুবাইদা রহমান কোনো বক্তব্য দেননি। মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানান। তারেক রহমানও হাত নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব দেন।
‘ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে’ : ভোর বেলা ভোটকেন্দ্রের সামনে লাইন করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ভোট শুরু হবে, সঙ্গে সঙ্গে ভোট দেওয়া শুরু করবেন। কিন্তু ভোট দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসলে হবে না। ভোটকেন্দ্রের সামনে থাকতে হবে। ভোটের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিয়ে আসবেন। বহু বছর হয়ে গেছে আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। যেহেতু আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এর আগে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ভোট লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এবার আমাদের সজাগ থাকতে হবে। যাতে কেউ আমাদের ভোট লুটপাট করে নিয়ে যেতে না পারে।
উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বলেন, পারবেন তো পাহারা দিয়ে সর্তক থাকতে। সমস্বরে সবাই হ্যাঁ বললে তারেক রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ।
নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড, বেকার সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাসহ সরকার গঠন করলে কী কী করতে চান তার একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধানের শীষের প্রার্থীদের জন্য ভোট চান তিনি।
দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ-৫ আসনের প্রার্থী জাকির হোসেন বাবুলের সভাপতিত্বে ও মহানগর সদস্য সচিব রুকুনুজ্জামান সরকার ও উত্তর জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেনের সঞ্চালনায় সমাবেশে ২৪ আসনের প্রার্থীরা ছাড়াও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলমসহ জেলা ও মহানগর নেতারা বক্তব্য রাখেন।
বিদ্রোহীদের অনুসারীরা আসেনি সমাবেশে : এদিকে ময়মনসিংহের বিভাগীয় নির্বাচনি জনসভায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম উপস্থিতির পেছনে নেতাকর্মীরা দুষছেন বিদ্রোহীদের। নেত্রকোনা জামালপুর শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে এই বিভাগীয় নির্বাচনি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে যোগ দেন ৫টি জেলার ২৪টি আসনের ধানের শীষের মনোনীত এমপি প্রার্থী।
সমাবেশে আসা নেতাকর্মীরা জানান, এই ২৪ আসনের মধ্যে প্রায় অর্ধেক আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও, ভালুকা, ত্রিশাল, গৌরীপুর, নান্দাইল এবং হালুয়াঘাটের আসনগুলোতে শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। তাদের সমর্থক ও অনুসারীরা এই সমাবেশে যোগ দেননি। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট করায় বেশিরভাগই দল থেকে বহিষ্কৃত। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বড় একটি অংশ সমাবেশে উপস্থিত হননি। এ নিয়ে সমাবেশস্থলেই নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে আলাপ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, বিদ্রোহীরা চাইলেও সমাবেশে আসতে পারেননি। আবার অনেকে বহিষ্কার থাকায় দলের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।
আগামীকাল যাবেন রাজশাহী : আগামীকাল রাজশাহীতে থেকে প্রচার শুরু করবেন তারেক রহমান। সকালে ঢাকা থেকে বিমানযোগে রাজশাহী পৌঁছাবেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে নেমে স্থানীয় একটি হোটেলে তরুণদের নিয়ে মতবিনিময় করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। দুপুরে রাজশাহী মাদরাসা মাঠে বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন। ওইদিন সন্ধ্যায় নওগাঁ এবং রাতে বগুড়ায় নির্বাচনি পথসভা করবেন তারেক রহমান। পরে নিজ বাড়ি বগুড়ার গাবতলিতে রাত্রিযাপন করবেন তিনি। ৩০ জানুয়ারি দুপুরে বগুড়া নিজ নির্বাচনি এলাকায় ধানের শীষের জন্য ভোট চাইবেন তারেক রহমান।
সময়ের আলো/এনএ