প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫৪ এএম আপডেট: ২৮.০১.২০২৬ ৭:০৯ পিএম
তুরাগ নদের পাড় দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ ক্যাম্পাস। মঙ্গলবার তোলা। ছবি : সময়ের আলো ‘আমি নিজ চোখে এই পুরো এলাকা ভরাট হতে দেখিছি। আবাসন ও অবকাঠামো পুরোটাই নির্মাণ হয়েছে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে। তখন পুরো এলাকায় দখলের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল।’ মোহাম্মদপুর রামচন্দ্রপুর খালের জলাশয় ভরাট করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন কালাম হোসেন। তিনি এই এলাকায় ১৯৮০ সাল থেকে বাস করছেন।
ক্যাম্পাসের প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে এই এলাকায় আমরা বন্ধুরা মিলে মাছ ধরতাম। ২০১০ সালের দিকে পুরোদমে জলাশয় ভরাট করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস করা হয়।
সরেজমিন মোহাম্মদপুরের আদাবরে দেখা যায়, তুরাগ নদ ও রামচন্দ্রপুর খাল ভরাট করে দুই একর জমিতে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের চারদিকে বড় অংশ ছিল প্লাবনভূমি। নদ ও খালের সীমানা খুঁটির চিহ্ন এখনও রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র যাচাই করে দেখা যায়, ২০০৪ সালেও বাঁধের বাইরের পুরো এলাকা ছিল তুরাগ নদের অংশ। বছরের বিভিন্ন সময় সেখানে আসত নদীর পানি। কিন্তু সে বছর থেকেই সেখানে শুরু হয় ভরাটযজ্ঞ।
আগে যেখানে খাল ও জলাভূমি ছিল সেখানে এখন কংক্রিটের স্থাপনা, ভবন নির্মাণ ও ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুমে এই জলাধার আশপাশের এলাকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত। জলাধারটি ভরাট হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের সড়ক ও বাসাবাড়িতে পানি জমে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের দাবি, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইনের যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই এই ভরাট কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আর প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ভবন নির্মাণ করায় ওই এলাকার স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির প্রশাসন বলছে, ক্যাম্পাস নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন রয়েছে। তাদের দাবি এটি কোনো প্রাকৃতিক জলাধার নয়, বরং পরিত্যক্ত জমি ছিল। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো নথিপত্র তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি তারা।
পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন, জলাধার ও জলাভূমি ধ্বংস করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সংবিধান ও পরিবেশ আইনের পরিপন্থী। তারা অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে এই ভরাট কার্যক্রম চালানো হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, কোনো প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও যথাযথ অনুমোদন বাধ্যতামূলক। তবে স্থানীয়দের দাবি, এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং জলাভূমি সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী এসব এলাকার শ্রেণি পরিবর্তন বা ভরাটের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
দেশের অন্যতম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মোহাম্মদপুর এলাকার ইকবাল রোডে অবস্থিত। পরে ২০২৩ সালে মোহাম্মদপুরের আদাবরে ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় দুই একর জমির ওপর নির্মিত এ ক্যাম্পাসে ২০১৫ সাল থেকে আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। তার আগে থেকে জলাশয় ভরাট ও ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের আদাবরের ৫/বি বেড়িবাঁধ মেইন রোডে অবস্থিত জলাশয় ভরাট করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থায়ী বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ডিজিটাল লাইব্রেরি, অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, কম্পিউটার ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম, সুপ্রশস্ত অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া ও বিশাল খেলার মাঠসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। ক্যাম্পাসের তিন তলাসহ বেশ কয়েকটি ভবন রয়েছে। ক্যাম্পাসের চারদিকে সীমানা প্রাচীর রয়েছে। পূর্বদিকে মেইন রোড, দক্ষিণ ও উত্তর দিকে সিএনজি, গার্মেন্টস কারখানা, বাসাবাড়ি ও অসংখ্য দোকান রয়েছে। ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিক অর্থাৎ পেছনের অংশেও একই অবস্থা রয়েছে। রয়েছে সিএনজি-অটোরিকশার গ্যারেজসহ অসংখ্য দোকানপাট। এই অংশে তুরাগ হাউজিংয়ের ১নং রোডের অবস্থান। যা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩০নং ওয়ার্ডের আওতাধীন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রাচীরঘেঁষা এই রোড দিয়ে একটু সামনের দিকে এগিয়ে দেখা গেছে কয়েকটি পিলার বসানো। যার একটি পিলারে লেখা রামচন্দ্রপুর, পিলার নং ২৪। তুরাগ নদের পাড়ে গড়ে উঠেছে বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা খরচ করে বসানো হয় সীমানা পিলার। কিন্তু এরই মধ্যে সেই সীমানা পিলারগুলো বেদখল হয়ে গেছে। পিলারসহ নদের জমি গিলে ফেলেছে প্রভাবশালী ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানকের ছত্রছায়ায় চলত বিশ্ববিদ্যালয়টি। তার প্রভাবে স্থায়ী ক্যাম্পাসটি নির্মাণ করা হয় বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডেও জাহাঙ্গীর কবীর নানকের প্রতিনিধি ছিলেন।
তুরাগ তীরেই শৈশব-কৈশোর কেটেছে স্থানীয় বাসিন্দা শামীম মিয়ার। জলাশয় ভরাট করে পরিবর্তনের দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছেন তিনি। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, তুরাগ শুধু একটি নদ নয়, এটি ঐতিহ্যের অংশ, ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু বাস্তবে অনেক আগেই খালে রূপ নিয়েছে তুরাগ। দুইপাড়ে বালু ফেলে ভরাট করে গড়ে তোলা সারি সারি শিল্প-কারখানা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের এই জায়গার পুরোটা ছিল পানি আর পানি। এখানে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এই এলাকায় রামচন্দ্রপুর খালসহ ছোট-বড় অনেক খাল ছিল। ধীরে ধীরে সবকিছু ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এগুলো এখন তো আর বলে লাভ নেই। তবে মনে হলে এখনও তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে।
এলাকার বাসিন্দা আবদুল বাসেত আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ছোটকাল থেকে দেখেছি এটি পুরোটা তুরাগ নদের অংশ ছিল। এখন সুবিশাল বহুতল ভবন। একদিকে গড়ে উঠেছে ঘনবসতি অন্যদিকে শিল্প-কারখানাও বেড়েছে সমানতালে। এখন চারপাশ ভরাট করে ভবন বানানোর কারণে একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। এ ক্ষেত্রে ভরাট হওয়া খালগুলো বাঁচানো সম্ভব কি না তারা সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকায় দুই দশকের পরিস্থিতি নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে নগরে জলাশয় ও খোলা জায়গার পরিমাণ কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমেছে। আর মোহাম্মদপুর-বসিলা-আদাবর অঞ্চল ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলাধার এলাকা। এখানে যেভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে, তা নগর পরিকল্পনার চরম ব্যর্থতার উদাহরণ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশ সত্ত্বেও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি সরকার। অথচ নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে এসব খাল ও প্লাবনভূমি কারা দখল করেছে সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমরা আরও দায়িত্বশীল আচরণ আশা করি।
এ বিষয়ে নদী নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, নদীর সীমান্ত খুঁটিগুলোর বর্তমান অবস্থাকে নদীটির সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অবকাশ নেই। বসিলা সেতুর কাছে চর ওয়াশপুর থেকে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর বেইলি ব্রিজের কাছ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার নদীই উধাও করে দেওয়া হয়েছে। বসিলা ব্রিজের কাছে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের সংযোগস্থলে মাইশা গ্রুপের পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হওয়ার পর থেকে পুরো ১৬ কিলোমিটার ধীরে ধীরে দখল হয়ে যায়। এখন মনে হবে, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ বোধহয় একটাই নদী। অথচ সদরঘাট থেকে এলে বসিলার কাছ থেকে বাম দিকে বুড়িগঙ্গা ও ডানদিকে তুরাগ চলে গিয়েছিল। এর ফলে ধলেশ্বরীর সঙ্গে বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক সংযোগ বা প্রবাহপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নদীর জায়গায় কেউ কারখানা, কেউ বসতঘর, আবার মসজিদ বানিয়েও চালাচ্ছেন দখলদারিত্ব। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা বাস্তবায়নেরও অগ্রগতি নেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সময়ের আলো। তাদের বেশিরভাগ এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. সিদ্দিকুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, যে জায়গায় ভার্সিটি নির্মিত হয়েছে- তা আমাদের রেকর্ডকৃত সম্পত্তি। জলাশয় ভরাট করার বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।
নদী ও খাল দখল করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সময়ের আলোকে বলেন, রামচন্দ্রপুর খাল পুনরুদ্ধারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য আইনি বাধাগুলো দূর করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ঢাকার ২০টিরও বেশি খাল পুনঃখনন করেছি। যার ফলে এবার ঢাকার জলাবদ্ধতা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। সিটি করপোরেশন এসব ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সময়ের আলো/এনএ