স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর চারদিন পর মানবিক বিবেচনায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে অনেকটা গোপনীয়ভাবেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে সাদ্দাম পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যশোর ত্যাগ করে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওনা দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র জেল সুপার (সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট) মো. আসিফ উদ্দিন।
এর আগে, গত সোমবার হাইকোর্টের একটি ডিভিশন ফৌজদারি বেঞ্চ তার ছয় মাসের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
এদিকে, কারামুক্ত হয়েই সাদ্দাম পরিবারের সঙ্গে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে মোবাইল ফোনে সাংবাদিকদের তিনি জানান, আমার স্ত্রী-সন্তানের কবরের কাছে যেতে মন কাঁদছে। তিনি সেই উদ্দেশ্যেই রওনা হয়েছেন বলে জানান। এ সময় তিনি কারা কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার প্রত্যেক হাজতিকে দিয়ে কাজ করান, যা আইনবহির্ভূত। এছাড়া তিনি মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। যার ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বন্দি আত্মহত্যা করেছেন এবং একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনিও মানসিকভাবে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছেন।
সাদ্দাম দাবি করেন, আমি জেলারের পায়ে ধরে মুক্তি চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি দেননি। আমার জামিন হওয়া সত্ত্বেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কারাগারে আটকে রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমি তো অনেক বড় নেতা নই। আমি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। আমি কোনো দখলবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। এ দায়ভার কে নেবে? বলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
সূত্র জানায়, সাদ্দামকে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় প্রথম গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই মামলায় তিনি জামিন পান। এরপর আরও কয়েকটি মামলায় তাকে শোন অ্যারেস্ট দেখায় পুলিশ। এছাড়া তার নামে আরও কয়েকটি নতুন মামলা দেওয়া হয়। একইভাবে যখনই সাদ্দামের জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছাত, তখনই আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এভাবে ছয়টি মামলায় তার জামিন হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়।
সর্বশেষ গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই মামলায় তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন।
এর মধ্যে গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বিকেলে বাগেরহাটের বেখেডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের নিজ বাড়ি থেকে তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ এবং পাশে নয় মাস বয়সি শিশুপুত্র নাজিমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, মানসিক হতাশা থেকে সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন স্বর্ণালী।
তবে ২৪ জানুয়ারি প্যারোল না পাওয়ায় সাদ্দামের মৃত স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে নিয়ে যাওয়া হয়। কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জেলগেটের ভেতরে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য সাদ্দামকে তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে জেলগেটে মরদেহ দেখানোর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
যা নিয়ে পত্র পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলে উচ্চ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়। পরে হাইকোর্ট ২৬ জানুয়ারি তার ছয় মাসের জামিন মঞ্জুর করেন।
এদিকে, আলোচিত সাদ্দাম কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বের হয়ে বাগেরহাটে যাবেন এই খবরে দুপুর থেকে মিডিয়া কর্মীরা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান নিলেও পুলিশ নিরাপত্তার কারণে মিডিয়া কর্মীদের সাথে সাদ্দামকে দেখা করতে নিষেধ করেন। যার কারণে সাদ্দামের পরিবার মিডিয়াকর্মীদের এড়িয়ে অতি গোপনে তাকে নিয়ে বের হয়ে যান।
এসব বিষয়ে জানতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এফআর