ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ আর সামান্য ক্ষতিপূরণের বেড়াজালে বন্দি দেশের জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকেরা। ২০২৫-২৬ সালে শুধু পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন সার্টিফাইড ইয়ার্ডগুলোতেই গ্যাস বিস্ফোরণ ও উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো প্রায় ৮৪টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাব এবং বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষতিপূরণের একটি নির্দিষ্ট অযৌক্তিক মানদণ্ড নির্ধারণের জোরালো দাবি উঠেছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান)’ ও ‘অল ভিক্টিমস অ্যান্ড ভেটেরান্স নেটওয়ার্ক’ (এভিএন) যৌথভাবে ‘জাহাজ ভাঙার মানবিক মূল্য : বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জবাবদিহিতা, প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সীতাকুণ্ডের এস এন করপোরেশনে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে সাত শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে অতীতের ভয়াবহ চিত্রও। সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম মূল প্রবন্ধে জানান, ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শুধু এস এন করপোরেশনের তিনটি ইয়ার্ডেই ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও ৩০ জন আহত হলেও তাদের কোনো নিরাপত্তাসামগ্রী দেওয়া হয়নি। স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ২০২৪ সালের দুর্ঘটনায় নিহত হাবিবুর রহমানের স্ত্রী সাবিনা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়া অসম্ভব, মানুষের জীবনের মূল্য কি তবে মাত্র ৭ লাখ টাকাই?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজভাঙা খাতে আইনের অভাব না থাকলেও বহুমুখী কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকৃত অপরাধ বা দুর্ঘটনার কারণ আড়ালে থেকে যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না পাওয়ায় অন্যরা সতর্ক হওয়ার সুযোগ হারায়।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সহকারী পরিচালক মো. তৈয়্যেবুর রহমান বলেন, নামমাত্র ক্ষতিপূরণ মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য হতে পারে না। শ্রমিকের বয়স, কর্মক্ষমতা এবং পরিবারের মানসিক কষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ক্ষতিপূরণের মাপকাঠি নির্ধারণ করা উচিত। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার দুর্ঘটনার পর আইনি সহায়তার পাশাপাশি আগে থেকেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন আক্ষেপ করে বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে অধিকার আদায়ের লড়াইটি শ্রমিকদের জন্য একটি অসম যুদ্ধ, যেখানে মালিকপক্ষ ও রাষ্ট্র এক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সপ্রানের গবেষক জেবা সাজিদা সারাফের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সায়মা করিম শ্যানন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি ও প্রচার সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী।
সময়ের আলো/আতা