বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম কাদেরসহ অন্যান্য দলের প্রধান নেতাদের আসনভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। কে কত ভোট পাবেন, কার জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল হওয়ায় অধিকাংশ আসনেই তাদের শক্ত প্রার্থী রয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গেই। সে হিসেবে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে। এই নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যে দল তরুণ ও নারীদের ভোট নিজেদের পক্ষে বেশি নিতে পারবে সেই দল এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছেন তারা। তবে প্রত্যেক দলই তাদের প্রধান নেতার আসনে জয়ের বিষয়ে শতভাগ কনফিডেন্ট বলে দাবি করেছেন।
দলগুলো বলছে, প্রধান নেতার জয়ী হওয়া দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। না হলে এর নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দলে। দলীয় প্রধানকে বিজয়ী করার জন্য সব দলই আলাদা গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
দলগুলোর প্রধান নেতাদের মধ্যে শুধু তারেক রহমান ও ফয়জুল করীম ছাড়া সবাই একটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দেশের প্রধান তিন দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রধান নেতারা নির্বাচন করছেন ঢাকা থেকে।
বিএনপি : বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান লড়বেন ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে। ঢাকা-১৭ (গুলশান, বনানী, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাসানটেক) আসনে তারেক রহমানের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১২ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ডা. প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান।
জামায়াত ইসলামী ও ডা. খালিদুজ্জামানের সমর্থকদের দাবি, এই আসনে খালিদুজ্জামানের অবস্থান ভালো। জনগণ তার পক্ষে রয়েছেন, তিনি জয়ী হবেন। আর বগুড়া-৬ আসনে (সদর) তারেক রহমানের বিপক্ষে ভোট করছেন জামায়াতের মো. আবিদুর রহমানসহ ৪ প্রার্থী। এই আসনের সাধারণ ভোটাররা বলছেন, এ আসনে তারেক রহমান এগিয়ে রয়েছেন। এ দুই আসনেই প্রার্থীর পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রতিদিন তারেক রহমানের পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি বলছে, এবার ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। শুধু দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আসনই নয়, সারা দেশেই অধিকাংশ বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হবেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, তারেক রহমান কতটা জনপ্রিয় তা তার প্রতিটি সংযোগ কর্মসূচিই প্রমাণ। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৫টি আসনে নির্বাচনে অংশ নিতেন এবং প্রতিটি আসনেই জয়ী হতেন। সেই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানও ২টি আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন এবং সারা দেশেই ধানের শীষের প্রার্থীরা জয়ী হবেন।
জামায়াত : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান লড়বেন ঢাকা-১৫ (কাফরুল ও মিরপুর থানার আংশিক) আসন থেকে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী রয়েছেন মো. শফিকুল ইসলাম খান।
শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, ‘আমি বিএনপির পক্ষ থেকে লড়ছি। জামায়াতের আমিরের বিপক্ষে লড়ে আমি কোনো চাপ বোধ করছি না। আমি মিরপুরের সন্তান। জনসংযোগে ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমি আশা করছি এলাকাবাসী তাদের এলাকার সন্তানকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।
জামায়াত বলছে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন রকম। এবার নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। জনগণ পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তন এবারের নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সময়ের আলোকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা থাকে দলীয় প্রধান বিজয়ী হবেন। তিনিও প্রচার করছেন, আমরাও করছি। জনগণের বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হবেন। আমাদের যারা প্রচার চালাচ্ছেন সন্ত্রাসীরা তাদের নানাভাবে ডিস্টার্ব করছে। আমরা ইসিকে জানাচ্ছি, জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এর জবাব দেব। তিনি বলেন, সবদিক থেকে বিবেচনায় নিলে জামায়াত ইসলামী সারা দেশে এগিয়ে রয়েছে। জনগণ আমাদের গ্রহণ করেছে। আগে থেকেই তাদের পাশে থাকার কারণে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে বলে প্রত্যাশা করছি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) : ঢাকা-১১ (রামপুরা-বাড্ডা-ভাটারা-হাতিরঝিল আংশিক) আসন থেকে লড়বেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী রয়েছেন এম এ কাইয়ুমসহ আরও ৭ জন।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন সময়ের আলোকে বলেন, নাহিদ ইসলাম এনসিপির প্রধান ও গণঅভ্যুথানের নায়ক। এ ছাড়া সারা দিন ঢাকা-১১ আসনে তিনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষ করে তরুণ ও মা-বোনদের মাঝে শাপলা কলির ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এবার ভোটের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিপুল ভোটে নাহিদ ইসলাম জয়ী হবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এম এ কাইয়ুম সময়ের আলোকে বলেন, ভালো সাড়া পাচ্ছি। এই এলাকায় আমি ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কমিশনার ছিলাম। বিএনপি সরকার যতবার ক্ষমতায় এসেছে এই এলাকার মানুষ উপকৃত হয়েছে। যতবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ততবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ আগামী নির্বাচনেও ঢাকা-১১ আসনে ধানের শীষের বিজয় হবে।
এনসিপির নাহিদ ইসলাম এই আসনে নির্বাচন করবেন, এ বিষয়ে তিনি বলেন, এনসিপির নাহিদ এই আসনে নির্বাচন করবেন তাকে স্বাগতম। তিনি ফ্যাসিস্ট সরকার পতন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনিও আন্দোলনে ছিলেন। আমরাও এই আন্দোলনে ছিলাম। যেহেতু তার সংগঠন ওইভাবে নেই, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তার একটা ইমেজ আছে, সেটি কাজে লাগিয়ে তিনি (নাহিদ) নির্বাচন করবেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে জয় ধানের শীষেরই হবে।
সাধারণ ভোটাররা বলছেন, বিএনপি নেতা কাইয়ুম সিনিয়র রাজনীতিবিদ। অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম গণঅভ্যুত্থানের প্রধান সেনাপতি। এই আসনে নাহিদ ও কাইয়ুমের যে কেউ জয়ী হতে পারেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ : বরিশাল-৫ (সদর-সিটি) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে লড়বেন দলটির জ্যেষ্ঠ আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম। তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই দুটি আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হতে হবে ফয়জুল হককে। বিএনপির এই দুই প্রার্থীই সাবেক এমপি। একজন সরোয়ার হোসেন, আরেকজন আবুল হোসেন।
স্থানীয়রা বলছেন, এ দুই আসনে বিএনপির সাবেক দুই এমপির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার মতো সাংগঠনিক অবস্থা হাতপাখার নেই। তবে এবার জনগণ ভোট দিলে তিনি জয়ী হতে পারেন।
আবুল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আমি আগেও এই এলাকার এমপি ছিলাম। ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আমার জনপ্রিয়তা রয়েছে। ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। বিপুল ভোটে জনগণ আমাকে জয়ী করবে।
জাতীয় পার্টির (জাপা) : রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী রয়েছেন মো. সামসুজ্জামান সামু এবং জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহবুবুল হক বেলাল। জিএম কাদের এবং সামসুজ্জামান সামুর সমর্থকদের দাবি, এই আসনে লাঙ্গল এবং ধানের শীষ এগিয়ে রয়েছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম ইয়াসির সময়ের আলোকে বলেন, আল্লার রহমতে লাঙ্গলের পক্ষে ভালো সাড়া পাচ্ছি। মানুষ বলছে, আপনার চিন্তা কইরেন না লাঙ্গল মার্কায় ভোট দেব। এই আসনে যতবার লাঙ্গল ছিল উন্নয়ন হয়েছে। তাই ভোট দেবে। আমরা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। এই আসনে লাঙ্গলের ভোট সবচেয়ে বেশি।
বিএনপির রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতা সামসুজ্জামান সামুর সমর্থকরা বলছেন, সামু রংপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির আষ্টেপৃষ্টে বেড়ে ওঠা সামসুজ্জামান সামু ঐহিত্যবাহী কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং পরবর্তী সময়ে রংপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। এবার ধানের শীষের জোয়ার উঠেছে। সামুকে বিজয়ী করে তারেক রহমানকে আমরা আসনটি উপহার দেব।
এ ছাড়া বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে লড়ছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহ আলম ও জামায়াতের প্রার্থী আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে তাকে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়বেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে। এই আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল খালেক স্বতন্ত্র প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছেন মো. মহসীন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন সময়ের আলোকে বলেন, এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি সবদিক থেকে বড় দল এবং ধানের শীষের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান নেতারা যেসব আসনে নির্বাচন করছেন সেখানে প্রতিটি আসনেই রয়েছে বিএনপির শক্ত প্রার্থী। সেদিক থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তারেক রহমানের দুটি আসনেই জয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
জামায়াত আমিরকে ধানের শীষের প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হতে হবে। এনসিপির নাহিদ ইসলামকে লড়তে হবে বিএনপির সিনিয়র নেতা এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে। ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম লড়বেন বিএনপির সাবেক এমপি সরোয়ার ও আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে, সেখানে জয়ী হওয়া কঠিন। খেলাফতের মামুনুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বীও ধানের শীষের ববি হাজ্জাজের সঙ্গে। বিএনপি ছাড়া অন্য দলের প্রধানদের জন্য ধানের শীষের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় জয়ী হওয়াটা তাদের জন্য কঠিন হবে।
সময়ের আলো/কেএইচও