আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই জমে উঠছে। গত দেড় বছর ধরে মাঠে সক্রিয় ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন। সাংগঠনিকভাবেও জামায়াত এই আসনে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরও জামায়াত হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি ১১ দলীয় জোটের আসন ভাগাভাগির সমীকরণে গাজীপুর-৩ আসনে জামায়াত বঞ্চিত হয়। আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে। দলটির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান মাওলানা এহসানুল হক যিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতা মাওলানা মামুনুল হকের ভাগনে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল। প্রার্থীর স্থানীয় পরিচিতি না থাকায় বিএনপি প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর বিজয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে মনোনয়ন দেওয়ায় ১১ দলীয় জোট কার্যত মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়েছে বলেও মতামত দিয়েছেন অনেক ভোটার।
গাজীপুর-৩ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রিকশা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মাওলানা এহসানুল হক বলেন, আমি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনে এসেছি। রিকশা যেমন সাধারণ মানুষের বাহন, তেমনি আমার রাজনীতি সাধারণ মানুষের কথা বলার রাজনীতি। আমি চাই এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে দুর্নীতি, দুঃশাসন ও বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না। আমার ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নৈতিকতার ভিত্তিতে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, যুবসমাজকে মাদক ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রেখে কর্মমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। কৃষক তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে, শ্রমিক পাবে ন্যায্য মজুরি আর সাধারণ মানুষ পাবে নিরাপদ জীবন ও বাকস্বাধীনতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহভীরু, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই আমার অঙ্গীকার। আমি আপনাদের কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের আহ্বান জানাতে এসেছি। আসুন, রিকশা প্রতীকে ভোট দিয়ে সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে রায় দিন।
গাজীপুর-৩ আসনকে একটি আধুনিক, মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও ভূমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে গাজীপুর-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, আমি এমন একটি গাজীপুর গড়তে চাই যেখানে কোনো মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী বা দুর্নীতিবাজের জায়গা হবে না। ভূমি দখলদারদের কবল থেকে সাধারণ মানুষের জমি উদ্ধার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু আরও বলেন, এই জনপদের উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তাঘাট নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। আমি শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ ও যুগোপযোগী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করব।
তিনি জানান, নির্বাচিত হলে প্রতিটি গ্রাম এবং ওয়ার্ডে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, ডিজিটাল সেবা সহজীকরণ এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গড়াই হবে তার অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোট ও ভালোবাসা নিয়ে সংসদে গিয়ে আমি গাজীপুর-৩-এর মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করতে চাই। মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও ভূমি দখলমুক্ত গাজীপুর-৩ গড়াই আমার অঙ্গীকার। আমি কিছু হতে পারি আর না পারি, আমি আপনাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব ইনশাআল্লাহ।
এদিকে নির্বাচনি মাঠে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান মিলন বিএনপির সাবেক নেতা হওয়ায় দলটির ভেতরের একটি অংশ গোপনে তাকে সমর্থন দিতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। ফলে এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলনের মধ্যেই মূল লড়াই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইজাদুর রহমান মিলন। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের প্রত্যয় নিয়ে তিনি এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বলে জানান। ইজাদুর রহমান মিলন বলেন, আমি আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গাজীপুর-৩ আসনের মানুষের সেবা করে যেতে চাই। সে লক্ষ্যেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে আছি। তিনি জানান, গ্রামের সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন। এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা ও উন্নয়ন প্রত্যাশাই তার রাজনীতির মূল প্রেরণা।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তিনি জানান, দল থেকে বের হয়ে আসার পর তিনি দলীয় সব কার্যক্রম থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে রেখেছেন এবং বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তিনি কোনো সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই এবং দলীয় কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন না। ইজাদুর রহমান মিলন আরও বলেন, সব হিংসা-বিবাদ ভুলে গাজীপুর-৩ আসনের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই। এই আসনকে একটি আধুনিক, মানবিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধশালী জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাব।
সরেজমিন স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় গাজীপুর-৩ আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয় ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তবে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে দলটির নেতাকর্মীরা অনেকটাই আত্মগোপনে চলে যান। এর ফলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় এককভাবে বিএনপির হাতে চলে আসে। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে জোটের আসন ভাগাভাগিতে বঞ্চিত হওয়ায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
গাজীপুর-৩ আসনে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর পাশাপাশি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাফেজ আলমগীর হোসেন, ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি শামীম আহমেদ, জাতীয় পার্টির মো. নাজিম উদ্দিন এবং বাসদের আতিকুল ইসলাম পিয়াল। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ, জোটের হিসাব-নিকাশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সক্রিয়তায় গাজীপুর-৩ আসনের নির্বাচন এবার বেশ জমজমাট হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনটি শ্রীপুর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা এবং গাজীপুর সদর উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ১৯০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৭ হাজার ১৬২ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৭ জন। সর্বমোট ১৮০টি ভোটকেন্দ্রে ৯৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।