পাঁচ বছর আগে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারিতলা ইউনিয়নের মোসলেমাবাদ গ্রামের মৃত সুলতান আহম্মেদের ছেলে মেহেরাব হোসাইন। গুরুতর জখমের কারণে চিকিৎসকরা ওই সময় তার দুই হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে বাধ্য হন। জন্মের আগেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা হারানো মেহেরাব পঙ্গুত্ববরণ করে নিতে বাধ্য হন। হাত হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। তবে তিনি দমে যাননি। অভাবের সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে মেহেরাব বুকে সাহস নিয়ে তার দুই কনুইয়ের সাহায্যেই শুরু করেন একটি চায়ের দোকান।
সরেজমিন মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী বাজারে গিয়ে মেহেরাবের দেখা মেলে। আলাপকালে তিনি জানান, জন্মের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার বাবা। মা খাদিজাতুন কুবরা আর নতুন করে সংসার জীবন শুরু করেননি। এখন মা, স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে ছোট্ট সংসার মেহেরাবের। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এখন তিনিই।
জোড়খালী বাজারে একটি বটগাছের নিচে মেহেরাবের দোকানে গিয়ে দেখা গেল তার চা বিক্রির কৌশল। প্রথমে পরম যত্নে চায়ের কাপ ধুয়ে তাতে চিনি ও আদা নিয়ে জ্বলন্ত চুলা থেকে দুই কনুই দিয়ে বিশেষ কায়দায় কেটলি ধরে কাপে ঢেলে নিলেন গরম চা। এরপর চামচ দিয়ে নাড়িয়ে চা তৈরি শেষে দুই কনুইয়ের সাহায্যে চায়ের কাপটি তুলে দিলেন ক্রেতার হাতে। এভাবে এই তরুণ চালিয়ে যাচ্ছেন তার নিজের ছোট্ট চায়ের দোকান।
মেহেরাবের কথায়, বাবার অনুপস্থিতিতে দারিদ্র্যের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নানা কাজ করে মাকে সহযোগিতা করতেন তিনি। কখনো শ্রমিক, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন মেহেরাব।
কাজের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি কিন্তু ২০২০ সালে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন মেহেরাব। দুর্ঘটনায় দুই হাত হারানোর পর তিনি ও তার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সে সময় মানুষের সহায়তায় কিছু দিন চলে তাদের সংসার। পরে ২০২৩ সালে জোড়খালী বাজারে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান শুরু করেন আত্মপ্রত্যয়ী মেহেরাব।
জামালপুর থেকে মেহেরাবের দোকানে চা খেতে আসা জাহাঙ্গীর আলম, ময়না আকন্দ, আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সেনা সদস্য বিপুল মিয়াসহ কয়েকজন বলেন, ভিক্ষার পথ বেছে না নিয়ে পরিশ্রম করে সংসার চালাচ্ছেন মেহেরাব। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই দোকান চালাচ্ছেন। এ সময় তারা সরকার ও বিত্তবানদের মেহেরাবকে একটি পাকা দোকান ঘর ও কিছু মূলধন দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানান।
প্রতিদিন দোকান থেকে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা লাভ হয় তার। এই টাকা দিয়েই সংসার চালাতে হয় তাকে। মেহেরাব বলেন, আল্লাহ আমার হাত দুটি নিয়ে গেছেন কিন্তু মনোবল তো আর নেননি। প্রথমে দুই হাত ছাড়া চলাফেরা করতে অনেক সমস্যা হতো। কিন্তু এখন আর সমস্যা হয় না। সবকিছুই মানিয়ে নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে চলছি। তাতেই আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া।
মেহেরাবের মা খাদিজাতুন কুবরা বলেন, স্বামী হারানোর পর একমাত্র সন্তানকে নিয়েই বেঁচে আছি। ছেলেটার হাত কাটা গেলেও কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করিনি। আল্লাহর ইচ্ছায় এই দোকান দিয়েই আমাদের সংসার চলছে।
মাদারগঞ্জ থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, আমি মাদারগঞ্জ থানায় নতুন যোগদান করেছি। শুনেছি জোড়খালী বাজারে দুর্ঘটনায় হাত হারানো এক যুবক অনেক কষ্ট করে চায়ের দোকান দিয়ে তার সংসার চালাচ্ছে। এ ধরনের আত্মপ্রত্যয়ী যুবকের পাশে থাকা আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমি তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব এবং আমি নিজেও তার খোঁজখবর রাখব।
মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন, মানসিক দৃঢ়তা আর শক্ত মনোবল মানুষকে যে এগিয়ে নেয়, মেহেরাব তার একটি বড় উদাহরণ।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম আরও বলেন, বর্তমানে মেহেরাব প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে তার মাকেও বিধবা ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/কেএইচও