বিমানবন্দরের ভিআইপি গেটের সামনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। গেটজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বর্ণিল সাজে সজ্জিত সেই বিখ্যাত ছাদখোলা বাস। বাসের গায়ে চ্যাম্পিয়ন মেয়েদের হাস্যোজ্জ্বল ছবি। উইমেন্স সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফেরা বাংলার বাঘিনীদের বরণ করে নিতে রাস্তার দুই ধারে সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড়। সবার হাতে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড আর কণ্ঠে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগান। চারিদিকে কেবল উৎসবের আমেজ।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন বিমানবন্দরের গেট খুলল, দেখা গেল সেই চেনা দৃশ্য। ফুলের মালায় ঢাকা শরীর, বাঁ-হাতে পরম মমতায় ট্রফিটি আগলে রেখে দলের নেতৃত্বে সবার সামনে বেরিয়ে এলেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। মুখে সেই চেনা বিজয়ী হাসি। এই দৃশ্য যেন দেশের মানুষের কাছে এক মধুর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই নিয়ে তৃতীয়বার ট্রফি হাতে বীরের বেশে বিমানবন্দরে পা রাখলেন সাবিনা। ২০২২ সালে প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ছাদখোলা বাসে চড়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে কাঠমান্ডু জয় করে সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছিলেন। আর এবার ২০২৪-এর শেষে কিংবা ২০২৫-এর শুরুতে থাইল্যান্ড থেকে আনলেন ফুটসালের মুকুট।
খেলোয়াড় থেকে কর্মকর্তা সবার গায়েই ছিল বিশেষ জার্সি, যাতে বড় করে লেখা ‘চ্যাম্পিয়ন’। সাবিনার পাশেই ছিলেন ইরানি কোচ সাঈদ খোদাহরাহমি। ফুটসাল কোচ হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম শিরোপার অংশ হতে পারার তৃপ্তি তার চোখে-মুখে। কৃষ্ণা রানী সরকার, মাসুরা পারভীন, মাতসুশিমা সুমাইয়া আর ঝিলিদের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল, ক্লান্তি তাদের স্পর্শও করতে পারেনি। ট্রফি উঁচিয়ে ফটোসেশনে দাঁড়াতেই চারিদিক মুখরিত হলো ‘হুররে’ শব্দে।
ভিড় ঠেলে ছাদখোলা বাসে উঠতে সাবিনাদের কিছুটা বেগ পেতে হলেও সমর্থকদের ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। বাসে ওঠার পর ওপর থেকে ঝরতে শুরু করল তাজা ফুলের পাপড়ি। বাসের ছাদ থেকে কখনো হাত নেড়ে, কখনো ট্রফি উঁচিয়ে সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছিলেন সাবিনা-ইতি-নোশিন-নীলারা। কেউ কেউ বিশালাকার লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে জানান দিচ্ছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব।
বাসের ওপর শুরু হলো অন্যরকম এক আমেজ। হালের জনপ্রিয় গান ‘আপাতে-আপাতে’র তালে তালে তাল মেলানো, সেলফি তোলা আর নিজেদের মধ্যে ফুল ছোড়াছুড়িতে মেতে উঠলেন চ্যাম্পিয়ন কন্যারা। কখনো বা নিজেদের হাতের ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন নিচে থাকা ভক্তদের দিকে। বাসের গায়ে লেখা, ‘লাল সবুজে লেখা এক বিজয়ের গল্প’। এই বিজয়ীর বেশেই বাসটি বিমানবন্দরের চত্বর ছেড়ে রওনা হলো হাতিরঝিলের এম্ফি থিয়েটারের দিকে, যেখানে তাদের জন্য জমকালো সংবর্ধনার আয়োজন করেছে বাফুফে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বসা সাফ উইমেন্স ফুটসালের প্রথম আসরে বাংলাদেশ ছিল অপ্রতিরোধ্য। সাত জাতির এই লড়াইয়ে ৬টি জয় ও একটি ড্র নিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লাল-সবুজের দল। কেবল ভুটানের বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্র করেছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো শক্তিশালী দলগুলোকে পাত্তাই দেয়নি সাবিনারা। আর অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ব্যক্তিগতভাবেও ছিলেন অনন্য টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৪টি গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করেন কেন তাকে দক্ষিণ এশিয়ার গোলমেশিন বলা হয়।
সময়ের আলো/জেডআই