প্রতিযোগিতায় প্রতিহিংসা

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ১২ দিন বাকি থাকলেও প্রত্যাশিত ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। অনেক ক্ষেত্রে

2026-01-30T01:37:36+00:00
2026-01-30T01:37:36+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
প্রতিযোগিতায় প্রতিহিংসা
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:৩৭ এএম   (ভিজিট : ১১২)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ১২ দিন বাকি থাকলেও প্রত্যাশিত ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও সংঘাত পূর্ব এবং সংঘাতকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। 

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাব সংঘাত-সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভোটের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার কথা বলা হলেও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটছে না। তফসিল ঘোষণার পর গত ৪৯ দিনে কমপক্ষে ১৬ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। প্রচার শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে গত বুধবার শেরপুরে প্রকাশ্য নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় জামায়াতের একজন নেতাকে।

পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভীতি দেখানো এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণ ছয়টি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ছয়টি, প্রচারকাজে বাধা ১৭টি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভ ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি। 

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ না করে এবং পুলিশ যথাযথভাবে সক্রিয় না হয়, তবে সামনে আসন্ন নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সংঘাত ও সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে ভীতি তৈরি করবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বাধাগ্রস্ত করবে। 

তিনি আরও বলেন, শুধু পুলিশের সক্রিয়তা যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনি সহিংসতা রোধে রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান অপরিহার্য। 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে জেলায় বেশি সংঘর্ষ হচ্ছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মীদের সংযত করতে দলের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ‘কারণ দর্শানোর নোটিস’ দুর্বল ব্যবস্থা; শুধু বিবৃতি বা শোকজে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ড. হক বলেন, শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলের যথাযথ ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোরতার অভাব দেখা যাচ্ছে। অন্য কোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন পরিস্থিতি ভিন্ন এবং তাই শুধু আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা যথেষ্ট হবে না; সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসেন জানান, পুলিশ সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচনের সময় কোনো পুলিশ সদস্য পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না তা নিশ্চিত করতে নজরদারি করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি বা অবহেলা ধরা পড়লে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

শেরপুরের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শেরপুরের ঘটনা হতাশাজনক। সেখানে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর হতে হতো। যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া নিরপেক্ষতার পরিচায়ক হতে পারে না। 

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি সংঘর্ষপ্রবণ কয়েকটি আসনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তবে অনেকেই সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে।

ড. হক নির্বাচনি সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, প্রার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক দূরত্বের অভাব। এক প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে দেখেন না, বরং মনে করেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাজেহাল না করলে তার বিজয় নিশ্চিত হবে না। এখান থেকেই সহিংসতার সূত্রপাত হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর গত ৪৯ দিনে কমপক্ষে ১৬ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১২ জন। অন্য চারজনের মধ্যে শহিদ ওসমান হাদি ছাড়া রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দুজন নেতাকর্মী এবং নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের এক নেতা।

তবে এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ সংঘটিত হয়েছে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত শত্রুতাসহ বিভিন্ন কারণে। এর মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫ জন।

গত ১২ ডিসেম্বর গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী শহিদ ওসমান হাদি। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে হত্যা করা হয়। ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজের রহমান ওরফে মুছাব্বিরকে। 

১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক মো. নজরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়।

সবশেষ গত ২৮ জানুয়ারি বুধবার শেরপুরে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিম।

পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ পূর্ববিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও হঠাৎ সংঘটিত সহিংসতার ফল। পুলিশ প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত করছে, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এফআর


  বিষয়:   ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন  গণভোটে  নির্বাচন  প্রতিযোগিতা  প্রতিহিংসা 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: