ভোরের কুয়াশা ভেদ করে সদর দারিয়পুর হাটের ব্যস্ত মোড়ে কাস্তে-কাঁচির প্রতীক। পাশেই চায়ের দোকানে জটলা— কে জিতবে, বড় দলগুলো নাকি লাল পতাকার এই প্রার্থীরা? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপে গাইবান্ধার রাজনীতি এবার শুধু প্রধান দলগুলোর দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ নয়, দুই আসনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে বামপন্থি দুই সংগঠন— বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী)।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বামপন্থিদের নির্বাচনি জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমঝোতার পথে হাঁটলেও, গাইবান্ধার দুই আসনে সে পথে হাঁটা হয়নি। ফলে গাইবান্ধা-২ (সদর) ও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে আলাদা আলাদা প্রার্থী নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছে দুই দলই। স্থানীয়রা বলছেন, গাইবান্ধার এই দুই আসনে কাস্তে আর কাঁচির মুখোমুখি লড়াই শেষ পর্যন্ত কতটা ছাপ ফেলতে পারে— তার উত্তর দেবে ব্যালটের বাক্স।
কাস্তে ও কাঁচির লড়াই : সদর আসনে সিপিবির প্রার্থী মিহির কুমার ঘোষ কাস্তে প্রতীক হাতে পাড়া-মহল্লায় ঘুরছেন। তার পাশেই বাসদের (মার্কসবাদী) আহসানুল হাবীব সাঈদ কাঁচি প্রতীক নিয়ে পথসভা করছেন নদীপাড় আর হাটবাজারে। আর সাঘাটা-ফুলছড়িতে সিপিবির শ্রী নির্মল ও বাসদের রাহেলা খাতুন— দুজনই চেষ্টা করছেন চরাঞ্চলের ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে। চরের এক কৃষক বলেন, বড় দলগুলো আসে গাড়ি নিয়ে, আর লাল পতাকার লোকজন আসে হেঁটে। ভালো ভালো কথা বলে তারা। কিন্তু ভোটে কতটা প্রভাব পড়ে সেটাই দেখার বিষয়।
আদর্শের প্রশ্ন, সমঝোতার সংকট : সিপিবির জেলা সাধারণ সম্পাদক মুরাদ জামান রব্বানী বললেন, আমাদের লক্ষ্য প্রগতিশীল, শ্রমিকবান্ধব ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গাইবান্ধায় জোটগত সমঝোতা হয়নি।
অন্যদিকে বাসদের (মার্কসবাদী) জেলা নেতা কাজী আবু রাহেন শফিউল্লাহ খোকন বলছেন, এই জেলায় কৃষক, ক্ষেতমজুর ও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে। লুটপাট, দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই আমাদের এই নির্বাচন।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা মনজুর আলম মিঠু বলেন, আমরা চাই সংসদ কোটিপতিদের ক্লাব না হয়ে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর হোক। মূল্যবৃদ্ধি, ন্যায্য মজুরি আর রেশনের প্রশ্নে ভোট হোক মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।
জেলার চিত্র, ভোটের অঙ্ক : রংপুর বিভাগের এই জেলা ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঁচটি সংসদীয় আসন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধায় মোট ভোটার ২১ লাখ ৯০ হাজার ৪০০। এর মধ্যে নারী ভোটার পুরুষদের চেয়ে ২৫ হাজার বেশি। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩৬ জন। নতুন ভোটার যোগ হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার।
জেলার ৬৭৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে রয়েছে ৪৭টি কেন্দ্র, যেখানে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজর দিচ্ছে প্রশাসন।
গাইবান্ধা-২ আসনে ভোটার ৪ লাখ ১১ হাজারের বেশি। এখানে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ঘিরে মূল আলোচনা। আর গাইবান্ধা-৫ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি। বিএনপি, জামায়াতের পাশাপাশি একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছেন।
বিশ্লেষকদের চোখে বামপন্থিরা : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় জোটের বাইরে মাঠপর্যায়ে বামপন্থিদের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত। সমন্বয়ের অভাব ও আসনভিত্তিক কৌশলের দুর্বলতা তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে শ্রমিক, কৃষক ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন জোরদার করতে পারলে ভবিষ্যতে তাদের প্রভাব বাড়তে পারে।
চায়ের দোকানে কথা হয় স্থানীয় একজন ভোটারের সঙ্গে। তিনি হেসে বললেন, জেতা-হারা বড়দের খেলা। তবে লাল পতাকার লোকজন অন্তত আমাদের কথা শোনে।
এফআর