প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৮ এএম আপডেট: ৩১.০১.২০২৬ ৯:৩০ এএম
ফাইল ছবিত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে নারীরা। মোট এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর বিপরীতে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৬ জন। যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ৩.৮৪। এরমধ্যে আবার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে কেবল ৮ জনের। যা শতকরা হিসেবে মাত্র ৯.৫। সংখ্যায় কম হওয়ার চেয়েও উদ্বেগজনক ভোটের মাঠে অনেকটা অসম যুদ্ধে পড়তে হচ্ছে নারীদের। রয়েছে প্রচারের অসমতা, সামাজিকমাধ্যমে নারীবিদ্বেষ, ধর্মীয় অপপ্রচার, নিরাপত্তাহীনতা ও সাইবার বুলিংয়ের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। ফলে ভোটের মাঠে পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় অনেকটাই অসম অবস্থান থেকে লড়াই করতে হচ্ছে নারী প্রার্থীদের। তবু সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন তারা।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে ৭৬ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালিকা লড়াইয়ে থাকা ৫১টি দলের মধ্যে ২০টি দলের নারী প্রার্থী রয়েছে। ৭৬ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১৫ জনই স্বতন্ত্র। দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০ জন করে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ৩১ দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। নিবন্ধিত ৯টি রাজনৈতিক দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। বাংলাদেশে ইসলামভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দল আছে, সেখানে সবচেয়ে বড় দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার ২৭৬ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এরমধ্যে একজনও নারী প্রার্থী নেই। অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ইতিহাসও নেই জামায়াতের। একই অবস্থা জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটেও। সেখানকার ইসলামী দলগুলোও যে আসন ভাগাভাগি করেছে সেখানে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এমনকি জোটে থাকা প্রচলিত ধারার অর্থাৎ, ধর্মভিত্তিক ধারার বাইরের দলগুলোর মধ্যে এনসিপি ছাড়া আর কোনো দলই জোটের ভাগাভাগিতে নারী প্রার্থী দেয়নি।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে মোটে ১০ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি, সংখ্যার হিসাবে কোনো দল থেকে এটাই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী প্রার্থী। তবে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সেই সংখ্যা ৯ জনে নেমে আসে। শতকরা হারে অবশ্য বিএনপির নারী প্রার্থী মাত্র ৩ শতাংশ।
নারী প্রার্থী হিসেবে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। ফরিদপুর-২ আসনের এই প্রার্থী সময়ের আলোকে বলেন, আমার আসনে ইসলামপন্থি দলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মসজিদ ও ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে ভোটের প্রচার করছেন। নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ আছে কেউ ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভোটের প্রচার করতে পারবেন না। এ ছাড়া সামাজিকমাধ্যমে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এগুলোর বিষয়ে কমিশনের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠু হলে এবং সব মানুষ ভোট দিতে পারলে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আমার আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে বেশ। তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদ প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জেলা বাসদের সদস্য সচিব চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী। সময়ের আলোকে বরিশাল-৫ আসনে বাসদের এই প্রার্থী বলেন, প্রথমত আমি কোনো নারী হিসেবে ভোটে লড়াই করছি না। একজন মানুষ ও প্রার্থী হিসেবে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই করছি। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে ভোট করছি। নারী ট্যাগ দিয়ে আমাকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। আমার আসনে নারীবিদ্বেষ ছড়িয়ে কিছু মৌলবাদী প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, যদি টাকা ওড়ানো না হয়, নির্ভয়ে মানুষ ভোট দিতে পারে, পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন হয় তা হলে আমিই এগিয়ে থাকব।
নাটোর-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল সময়ের আলোকে বলেন, আমরা আসনে নারী ভোটার বেশি। নারীদের কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিব। কৃষিপণ্য আর নারীদের হাতের কাজকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। সর্বোপরি নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে কেবল রফতানি আয় বাড়বে না, বরং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে নারীরা।
তিনি বলেন, এটাই আমার প্রথম নির্বাচন। আগের অভিজ্ঞতা না থাকলেও বাবার নির্বাচন দেখে বড় হয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী হিসেবে ভোট করার চ্যালেঞ্জ অনেক। আশা করি, জনগণ তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে সংসদে পাঠাবে।
তৃণমূলে নারী প্রার্থীদের কোনো সহযোগিতা পান না দাবি করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির প্রার্থী তানিয়া রব। তবে তার আসনে (লক্ষ্মীপুর-৪) নারী ভোটাররা ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুরে আমাদের সংগঠন শক্তিশালী থাকায় এখনও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নারীরা সহযোগিতা করছে। তারা আমার পাশে আছেন। এখনও আমাকে কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি। সবাই নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমার জয় অনেকটা নিশ্চিত।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জোটের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার। দলীয় প্রতীক মাথাল তার ভোটের মার্কা। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এই আসনে ১৫ প্রার্থীর মধ্যে আমিই একমাত্র নারী। তবে আমি নারী হিসেবে নিজেকে মনে করছি না। একজন প্রার্থী হিসেবেই লড়াইয়ের ময়দানে আছি। নির্বাচন করছি এটাই বড় আন্দোলন। হার-জিত পরের প্রশ্ন। আমি নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে ভোটারের কাছে যাচ্ছি। শ্রমজীবী ও নারীর মর্যাদার প্রশ্নে আমি যেভাবে মানুষের কাছে হাজির হচ্ছি, আশা করি এ জন্য তারা আমাকে এগিয়ে রাখবে। তিনি বলেন, ভোটের মাঠে আমি নতুন। এর আগে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আর ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ যদি বলি- কিছু জায়গায় আমার বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমি তদন্তের দাবি জানিয়েছি।
ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের মডেল মেঘনা আলম গুরুতর অভিযোগ করেছেন। আরোচিত এই মডেল দাবি করেন, তাকে সামাজিকমাধ্যমে বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরা সেক্সুয়াল হুমকি দিচ্ছে। অনেক বাজে মন্তব্য করছে। নারীদের জন্য ভোটে নিরাপত্তার সংকট রয়েছে উল্লেখ করে মেঘনা আলম কিছুটা বিরতি নিয়ে প্রচার কৌশলে পরিবর্তন আনার পথ খুঁজছেন।
এছাড়া ১০ নারী প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)। জাতীয় পার্টির নারী প্রার্থী ছয়জন। দলটির মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১৯৬ জন। গণফোরামের নারী প্রার্থী দুজন। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদে চারজন নারী প্রার্থী। এই দলের নারী প্রার্থীর হার ১০.২৫ শতাংশ। ন্যাশনাল পিপলস পার্টির একজন নারী প্রার্থী, ইনসানিয়া বিপ্লব বাংলাদেশের চারজন নারী প্রার্থী।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির দুজন নারী প্রার্থী। তারা হলেন- ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারভীন ও ঢাকা-২০ আসনে নাবিলা তাসনিদ। গণসংহতি আন্দোলনের নারী প্রার্থী তিনজন। গণঅধিকার পরিষদে নারী প্রার্থী তিনজন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ছয় নারী প্রার্থী। নাগরিক ঐক্যের একমাত্র নারী প্রার্থী শাহানাজ হক লড়ছেন পাবনা-৪ আসনে। বাংলাদেশের রিপাবলিকান পার্টির একমাত্র নারী প্রার্থী কুষ্টিয়া-৩ আসনের রুম্পা খাতুন। এবি পার্টিতেও একজন নারী প্রার্থী ঢাকা-১০ আসনের নাসরিন সুলতানা।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির দুজন নারী প্রার্থী। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির একমাত্র নারী প্রার্থী জলি তালুকদার লড়ছেন নেত্রকোনা-৪ আসনে। আমজনতার দলেও একজন নারী প্রার্থী শরিফা আক্তার রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের একমাত্র নারী প্রার্থী আয়েশা আক্তার। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে। বাংলাদেশ লেবার পার্টির নারী প্রার্থী চাঁদপুর-২ আসনে নাসিমা নাজনিন সরকার।
স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী আছে ১৫ জন। তবে কুমিল্লা-৯ আসনে সামিরা আজিম বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে ভোটের মাঠে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে জুনায়েদ আল হাবীবের (খেজুর গাছ) সঙ্গে ভোটের মাঠে শক্ত লড়াই করছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা (হাঁস)। দলের বাইরে গিয়ে ভোট করায় বিএনপি থেকে হয়েছেন বহিষ্কার। তবুও মাঠ ছাড়েননি।
আলোচিত প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, হাঁস হলো সততা ও সাহসের প্রতীক। ৩০০ আসনের এমপির বিরুদ্ধে, সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলার প্রতীক। কেউ যেন ভোট কারচুপির স্বপ্ন না দেখে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ এলাকার মানুষ তাদের প্রতিহত করবে। ভোট সুষ্ঠু হলে তিনিই বিজয়ী হবেন। টাকার বিনিময়ে কিংবা ভয়ভীতির মুখে অন্য কোথাও ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটা ভোট অনেক মূল্যবান।
ভোটের অভিজ্ঞতা আছে যাদের
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ৭৬জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ভোট করার অভিজ্ঞতা আছে মাত্র আটজনের। এর মধ্যে মাত্র তিনজন সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
ঝালকাঠি-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ইসরাত জাহান ইলেন ভুট্টো। তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। বিএনপি নেত্রী শামা ওবায়েদ এর আগে দুইবার নির্বাচন করে পরাজিত হন।
এবার শেরপুর-১ আসনের বিএনপির সানসিলা জেবরীন ২০১৮ সালেও নির্বাচনেও ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। রংপুর ৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। রিটা রহমান এর আগে বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। লড়াই করে হেরে যান। তৃণমূল বিএনপি থেকে অন্তরা সেলিমা হুদা ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এবার ভোট করছেন ঢাকা ১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। বিএনপির রুমিন ফারহানা ও জাতীয় পার্টির নুরুন নাহার বেগম ছিলেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য। এবার তারা ভোটে সরাসরি লড়াই করছেন। এর মধ্যে রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র এবং ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাপা থেকে প্রার্থী হয়েছেন নুরুন নাহার। এ ছাড়া ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদ প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী।
সময়ের আলো/জেডআই