মার্কিন মহড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ, ট্রাম্পের সুর নরম

তৌহিদুজ্জামান সোহান

ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জাহাজ শুক্রবার আকাবা উপসাগরে ভিড়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান। সংবাদমাধ্যমটি

2026-01-31T00:27:34+00:00
2026-01-31T00:27:34+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
মার্কিন মহড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ, ট্রাম্পের সুর নরম
সবদিক দিয়ে ইরানে হামলার সুযোগ নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:২৭ এএম 
মার্কিন মহড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জাহাজ শুক্রবার আকাবা উপসাগরে ভিড়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান। সংবাদমাধ্যমটি এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উন্নত সামরিক প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এক নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে কান জানায়, এই উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সামরিক ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের অংশ। যার মধ্যে নৌবহর জোরদার করা এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক প্রস্তুতি বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নৌ-তৎপরতা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং ‘মাঠপর্যায়ের যেকোনো সম্ভাব্য পরিবর্তনের’ কথা মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ উভয় প্রস্তুতির স্তর বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সময় বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, তিনি ইরানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন। সে সময় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আকাবা উপসাগরমুখী। পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, তা বাস্তবায়নে সামরিক বাহিনী প্রস্তুত থাকবে।

ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সেটা করার পরিকল্পনা করছি।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড়, অত্যন্ত শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে এগোচ্ছে। যদি সেগুলো ব্যবহার না করতে হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’ বৃহস্পতিবার কেনেডি সেন্টারে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প সম্ভাব্য সংলাপের ধরন, সময়সূচি কিংবা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। এই মন্তব্য করার সময় ট্রাম্প ‘মেলানিয়া’ শীর্ষক একটি সিনেমার প্রিমিয়ারে উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক নামের সামরিক জাহাজটি নিয়ে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর মোট ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ মোতায়েন রয়েছে।

আকাবা উপসাগরটি সরাসরি ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এইলাতের দক্ষিণে অবস্থিত। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলার পর সৃষ্ট আর্থিক সংকটে গত জুলাই থেকে এই বন্দরটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি নিরাপত্তা বৈঠক করেন, যেখানে আলোচনার বিষয় ছিল একটি ‘গোপন ইস্যু’। টাইমস অব ইসরাইল জানায়, পশ্চিম জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মূলত ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান শ্লোমি বাইন্ডার তার আগে বুধবার ওয়াশিংটনে যান। চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, সেখানে তিনি ইরানে সম্ভাব্য ইসরাইলি হামলা নিয়ে ‘সংবেদনশীল বিষয়াদি’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়। ব্যাপক বিশৃঙ্খলায় সহিংস ওঠে সে বিক্ষোভ। তেহরান ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে। আন্দোলনের উসকানিদাতা হিসেবে দায়ী করে। এরপর জানুয়ারির শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ঘোষণা দেন, দাঙ্গাবাজদের জায়গা বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর থেকেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান শুরু হয়। এরপর তেহরান ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে লাখ লাখ সরকারপন্থি বিশাল সমাবেশ করে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সহিংসতার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে বলেন, বিক্ষোভে বহিরাগত ‘উপাদান’ ঢুকেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধে জড়ানো এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরু করানো। এরপর গত ১৫ জানুয়ারি ইরান বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করার পর ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দিমোনা, বীরশেবা ও গান ইয়াভনের কয়েকটি পৌরসভা জনসাধারণের জন্য বাঙ্কার তথা বোমা আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়। ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানায়, সেনাপ্রধান ইয়েল জামির এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর সব ইউনিটে ‘প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ’ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে কান আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসরাইলের নিরাপত্তা মহল। কারণ মূল্যায়নে বলা হচ্ছে ‘আগামী সময়টি হতে পারে নির্ণায়ক।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের কথা মাথায় রেখে ইসরাইলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে বেসামরিক জনগণের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তেহরান আগেই সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে।

চলমান সামরিক প্রস্তুতি : গত রোববার থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হয়। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ সেখানে পৌঁছে। ইসরাইলি গণমাধ্যমের মতে, এই মোতায়েনের ফলে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর সরাসরি আঘাত হানার মতো অবস্থানে পৌঁছে গেছে। চ্যানেল ১৩ জানায়, নৌবাহিনীর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার করছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি মোতায়েনের কথা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ইরানের দিকে একটি ‘বিশাল নৌবহর’ পাঠাচ্ছেন। তিনি তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু না করার হুঁশিয়ারি দেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জর্ডানে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান এবং কাতারে বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে। ফলে একাধিক দিক থেকে হামলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ আকবরজাদেহ সতর্ক করে বলেছেন, যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হবে, সেগুলোকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য করা হবে। তিনি ফার্স বার্তা সংস্থাকে বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো আমাদের বন্ধু, কিন্তু যদি তাদের ভূমি, আকাশ বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তা হলে তারা শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে।

সৌদি আরব ও কাতারসহ যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েতও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার বিরোধিতা করেছে। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, সংঘাতে তারা নিজেরাই জড়িয়ে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত। এমন তথ্য জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তবে আলোচনা হতে হবে তাদের শর্তে। যেটিকে তারা বর্ণনা করছে ‘ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও চাপমুক্ত পরিবেশ’ হিসেবে।

এএডি/
Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: