আর মাত্র ১০ দিন পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সারা দেশে বইছে নির্বাচনি হাওয়া। রাজনৈতিক অঙ্গনের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটের হিসাব-নিকাশেও ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। দুয়েকটি দল ছাড়া এবারের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতারাই নির্বাচনি লড়াইয়ে নেমেছেন। ফলে আসনভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ- কে কত ভোট পাবেন, কার জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু, তা নিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যাপক ইউনুস আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, এবি পার্টির ফুয়াদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতারা সরাসরি ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন।
দলগুলো বলছে, হেভিওয়েট প্রার্থীদের জয়ী করা দলীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে তাদের পরাজয় দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাদের আসনগুলোতে সব দলই আলাদা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে ৫১টি দল অংশ নিলেও ভোটের মাঠে মূলত দুই থেকে তিনটি দল এগিয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ না থাকায় অধিকাংশ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরেই রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান। পাশাপাশি এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল নির্দিষ্ট কিছু আসনে আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাদের আসনগুলোতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গেই। এ হিসাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে। তারা আরও মনে করেন, এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যে দল এই দুই শ্রেণির ভোট বেশি আদায় করতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। তবে প্রত্যেক দলই তাদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাদের জয়ের বিষয়ে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী বলে দাবি করছে।
বিএনপি : ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসন থেকে নির্বাচন করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মো. দেলাওয়ার হোসেন। তিনি এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. খাদেমুল ইসলামও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
এবারের হলফনামায় মির্জা ফখরুল তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মোট ৫০টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৪৭টি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন এবং বাকি তিনটিতে খালাস পেয়েছেন। এসব মামলা মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও বেআইনি সমাবেশসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা হয়। স্থানীয়দের মতে, এ আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই ফলাফলের ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন।
বিএনপি জানিয়েছে, প্রতিদিনই মহাসচিব ব্যাপক জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও ধানের শীষকে বিজয়ী করতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। নেতাকর্মীদের দাবি, মির্জা ফখরুলকে বিজয়ী করতে জনগণ মুখিয়ে আছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ নির্বাচনই আমার শেষ নির্বাচন। ঠাকুরগাঁওয়ে এখনও অনেক উন্নয়ন প্রয়োজন। মা-বোন ও তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা বহু বছর ভোট দিতে পারেননি। এবার সেই সুযোগ এসেছে। ধানের শীষে ভোট দিলে আমি সংসদে গিয়ে আপনাদের জন্য কাজ করতে পারব। আমি কাজের মানুষ।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, মির্জা ফখরুল একজন পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ। আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকার কারণে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বিএনপির মতো বড় দলের মহাসচিব বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জামায়াতে ইসলামী : জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও ক্যান্টনমেন্টের আংশিক) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগর। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন (ইয়াসমীন) লাঙ্গল প্রতীকে এবং চিত্ত রঞ্জন গোলদার কাস্তে প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
আলী আসগরের সমর্থকদের দাবি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং এ জোয়ারে অন্য প্রার্থীরা টিকতে পারবেন না।
জামায়াতের খুলনা জেলা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস বলেন, মিয়া গোলাম পরওয়ার আগে এমপি ছিলেন এবং দলমত নির্বিশেষে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে নির্বাচনি পরিবেশ কিছুটা প্রতিকূল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার দাবি, ধানের শীষের প্রার্থী কালো টাকা ছড়াচ্ছেন। তবে কোনো অপপ্রচারেই দাঁড়িপাল্লার জয়ের সম্ভাবনা ঠেকানো যাবে না।
এনসিপি : রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ভরসা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা এই আসনের রাজনীতিতে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে এনসিপি। আখতার হোসেন মাঠে নামায় ভোটের সমীকরণ বদলাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, আখতার হোসেন গণঅভ্যুত্থানের নায়ক। তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে তার পক্ষে ব্যাপক সাড়া রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন : খুলনা-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যাপক ইউনুস আহমেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী এস কে আজিজুল বারী। পাশাপাশি খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, ইউনুস আহমেদের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি হলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির সঙ্গে।
খেলাফত মজলিস : হবিগঞ্জ-৪ আসনে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের দেয়ালঘড়ি প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম ফয়সল। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত বলে দাবি করছে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, নির্বাচনি মাঠে প্রতিদিন জনসমর্থন বাড়ছে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আমরা আশাবাদী। সুষ্ঠু ভোট হলে জনগণ দেয়ালঘড়ির পক্ষেই রায় দেবে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম : নীলফামারী-১ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি জোটের প্রার্থী হওয়ায় এখানে ধানের শীষের প্রার্থী নেই। তার সমর্থকদের দাবি, বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় আফেন্দী ভালো অবস্থানে রয়েছেন।
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, জোটের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা আমাকে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আমরা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি : ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (কোদাল)। এই আসনে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী নেই। এখানে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াইয়ে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব। দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে নির্বাচন করছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম মিলন।
সাইফুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আমার নির্বাচনি আসনেও বিএনপির একজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এটা খানিকটা বিব্রতকর কিন্তু আমরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। কেননা দল ছাড়া হীরকরাজাও দিনশেষে জিরো। এখনও সময় আছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব সময়ের আলোকে বলেন, এখানে ধানের শীষ প্রতীক নেই, এখানে ধানের শীষ মানেই ফুটবল। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মার্কা ফুটবল। ইনশাআল্লাহ ফুটবল প্রতীক বিজয়ী হবে এবং তারেক রহমানকে আসনটি উপহার দেব।
এবি পার্টি : বরিশাল-৩ আসনে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলটির নেতারা বলছেন, পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ) বলেন, বরিশাল-৩ আসনে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা স্পষ্ট। মানুষ আর পুরোনো ধারার রাজনীতি চায় না। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ আমাদের পক্ষে রায় দেবে বলে বিশ্বাস করি।
জাতীয় পার্টি : গাইবান্ধা-১ আসনে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী নির্বাচন করছেন। তিনি ২০১৮ সালে উপনির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী সময়ের আলোকে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে মানুষ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে ভোট দেবে। শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়েই আমরা আশাবাদী।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, গণসংহতি আন্দোলনের বর্তমান নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সারও নির্বাচন করছেন না। এ ছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফীর মনোনয়ন কুমিল্লা-৫ আসনে বাতিল হওয়ায় তিনিও নির্বাচন করছেন না।
সময়ের আলো/কেএইচও