৭২ বছরের পুরাতন জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতিসহ নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও কাগজ উৎপাদন করে চলেছে কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম)। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইতিমধ্যেই এই মিল থেকে ৯১৪ টন কাগজ উৎপাদন শেষে ইসিতে পাঠানো হয়েছে। ১১ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কাগজ বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের (বিএসও) মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের আগেই পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া এই মিলের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে নতুন একটি কারখানা এবং ৬টি কেমিক্যাল প্লান্ট স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বছরে এক লাখ টন কাগজ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে, দেশের কাগজের চাহিদা পূরণ হবে এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কর্ণফুলী পেপার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ।
এসব বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে কর্ণফুলী পেপার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ছাপানো এবং অন্যান্য কাজ সম্পাদনের জন্য রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড থেকে চলতি অর্থবছরে ৯১৪ টন কাগজের চাহিদাপত্র দিয়েছিল বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিস (বিএসও) যার বর্তমান বাজার মূল্য ১১ কোটি ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮১ টাকা।
চাহিদাপত্রে উল্লিখিত নির্ধারিত সময়ের আগেই পর্যায়ক্রমে কর্ণফুলী পেপার মিলস কর্তৃপক্ষ এসব কাগজ সরবরাহ করেছে বলেও জানান কর্ণফুলী পেপার মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ। তিনি আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাড়ে ৩ হাজার টন কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার ছাপানোর জন্য নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের (বিএসও) মাধ্যমে কর্ণফুলী পেপার মিল থেকে বাদামি, সবুজ ও গোলাপি রঙের কাগজের চাহিদাপত্র দিয়েছে। আমরা তা সফলতার সঙ্গে পূরণ করে সরবরাহ করেছি। নির্বাচন কমিশন ছাড়াও বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১১টি প্রতিষ্ঠানে আরও ১ হাজার ২০০ টন কাগজ পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে।
নতুন কাগজকল স্থাপনের বিষয়ে কর্ণফুলী পেপার মিলের এমডি মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, নতুন কাগজকল স্থাপন হলে সেটার মাধ্যমে আমাদের পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। প্রতি বছর এক লাখ টন কাগজ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এক লাখ টন কাগজ উৎপাদন করা গেলে বিক্রির কোনো অসুবিধা হবে না বলেও আমরা মনে করি। কারণ আমাদের দেশে কাগজের বার্ষিক চাহিদা ১৩ থেলে ১৪ লাখ টন। তার মধ্যে ন্যাশনাল টেক্সটবুকের বার্ষিক ডিমান্ড হচ্ছে এক লাখ টন।
তাই উৎপাদন করলে বিক্রির কোনো অসুবিধা হবে না। এই কারখানাটি যেহেতু পুরোনো হয়ে গেছে, তাই সমস্যা অনেক। এসব সমস্যা দূর করতেই নতুন মিলের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে এলাকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন। দেশের কাগজের চাহিদা পূরণ হবে এবং বিদেশ থেকে আর আমদানি করতে হবে না। সেই হিসাবে এই কারখানার অনেক সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
সরেজমিন দেখা গেছে, পুরাতন জরাজীর্ণ ভবনে চলছে কাগজ উৎপাদনের কার্যক্রম। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিত্যক্ত মেশিনারি। এ সময় সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত অর্থবছরে ৩ হাজার টন কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন উৎপাদন করা গেছে। চলতি অর্থ বছরে ৩ হাজার ৫০০ টন কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৩০ টন কাগজ উৎপাদন করা হয়েছে। ৭২ বছরের পুরাতন এই মিলকে চাঙ্গা করতে নতুন মিল স্থাপন করতে হবে। কারণ বাজারে এই মিলের কাগজের চাহিদা আছে। উৎপাদনের আগেই নতুন নতুন অর্ডার পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্ণফুলী পেপার মিলে (কেপিএম) আগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে প্লান্টটি বন্ধ হয়ে যায়। তাই পুরাতন এই কারখানাকে একটি এন্টিগ্রেটেড পেপারমিল এবং ৬টি নতুন কেমিক্যাল প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবুজ পাতাভুক্ত হয়েছে প্রস্তাবনাটি। এটি অনুমোদিত হলে অদূর ভবিষ্যতে এখানে পুরোনো কারখানার জায়গায় নতুন একটা পেপারমিল এবং ৬টি কেমিক্যাল প্লান্ট স্থাপিত হবে।
এটি বাস্তবায়ন হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত তারা উপকৃত হবেন। পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার চাঙ্গা হবে। মানুষজন কর্মব্যস্ততা থাকতে পারবে। পেপার মিল তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলেও আশা সংশ্লিষ্টদের।
সময়ের আলো/কেএইচও