আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মধ্যে আসন সমঝোতায় সিলেটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সারা দেশে চারটি আসনে জমিয়তকে ছাড় দেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি স্পষ্ট করেছে, জোটগত সিদ্ধান্তের বাইরে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের যাওয়ার সুযোগ নেই। সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে জমিয়তের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে জোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই আলোচনায় এসেছে বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ ওরফে চাকসু মামুনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি এ ঘোষণা দিলে দল ও জোটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফলে সিলেট-৫ আসনে এখন মূলত তিনটি বাস্তব রাজনৈতিক মাত্রা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- জোট রাজনীতি, দলীয় শৃঙ্খলা এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা।
সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ বলেন, এ আসন মূলত বিএনপির ঘাঁটি। অতীতে সবসময়ই জোটের প্রার্থীরা বিএনপির ওপর ভর করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়েছেন। এবার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ চেয়েছিলেন ধানের শীষের প্রার্থী নির্বাচন করবেন। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত মানুষের আবেগের পক্ষে না থাকায় সাধারণ ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের তুমুল আগ্রহে আমি নির্বাচন করব।
সিলেট-৫ আসনে ভোটের হিসাব এখন অনেকটাই নির্ভর করছে জোট রাজনীতির কার্যকারিতার ওপর। যদি বিএনপি-জমিয়ত সমঝোতা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর থাকে, তা হলে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক স্পষ্টভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন।
জমিয়ত নেতারা জানান, এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক। বিএনপি এই আসনে ছাড় দেওয়ায় তার বিজয় সময়ের ব্যাপারমাত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সিলেট-৫ আসনে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুকের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত। এর কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি। ফলে দলীয় সাংগঠনিক শক্তি, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত এবং জোটগত সমর্থন- সবই তার পক্ষে কাজ করছে। দ্বিতীয়ত বিএনপির কেন্দ্রীয় ঘোষণার ফলে এই আসনে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নেই। মাঠ পর্যায়ে বিএনপির একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত জোটের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট এলাকায় ধর্মীয় ভোটব্যাংক, কওমি মাদরাসাভিত্তিক সমর্থন এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মাওলানা ফারুকের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে চাকসু মামুন স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং এলাকাভিত্তিক কাজের কারণে তার নিজস্ব একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে দলীয় প্রতীক ও কেন্দ্রীয় সমর্থন ছাড়া নির্বাচন করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা চাকসু মামুনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এ ছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে তার পক্ষে অবস্থান নিতে দ্বিধায় রয়েছে যা নির্বাচনি মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
চাকসু মামুনের অনুসারীদের দাবি, সিলেট-৫ আসনে ইসলামপন্থি দলগুলো বিভাজিত থাকায় পৃথকভাবে কারও ভোটব্যাংক নেই। এখানে বিএনপির ভোটারই বেশি। তুলনামূলক কম ভোট থাকা সত্ত্বেও জোটের সুবিধা নিয়ে ইসলামপন্থি দলগুলো নিজেদের প্রার্থী দিয়ে ধানের শীষের ভোট নিয়ে জয়ী হয়েছে। স্বাধীনতার পর আসনটিতে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি ও দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়। এ ছাড়া বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে জয়ী হয়েছেন।
সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবশেষ ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। ওই একবারই এখানে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হন। এরপর ২০০১ সাল থেকে জোট রাজনীতির অংশ হিসেবে বিএনপি আসনটিতে প্রতিবার ইসলামপন্থি দলের নেতাদের প্রার্থী করেছে।
২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে আসনটিতে জামায়াত নেতা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ২০০১ সালে বিজয়ী হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা উবায়দুল্লাহ ফারুক।
সেবার মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন) বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও জোট রাজনীতির ভাগ-বাটোয়ারার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত উবায়দুল্লাহ ফারুক চূড়ান্ত মনোনয়ন পান। সবকিছু বিবেচনায় সিলেট-৫ আসনে নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়; এটি হয়ে উঠেছে জোট রাজনীতি বনাম ব্যক্তিগত অবস্থানের লড়াই। বর্তমান বাস্তবতায় মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক জোটের শক্ত অবস্থান নিয়ে এগিয়ে থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী চাকসু মামুন কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।