যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নির্বাচনের আগেই বাণিজ্য চুক্তি

এমএকে জিলানী

বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, গম, ভুট্টা এবং এলএনজিসহ (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়াচ্ছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রের খবর,

2026-02-02T01:29:26+00:00
2026-02-02T01:29:26+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নির্বাচনের আগেই বাণিজ্য চুক্তি
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:২৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, গম, ভুট্টা এবং এলএনজিসহ (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়াচ্ছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রের খবর, দুই পক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আমেরিকান বোয়িং কোম্পানি থেকে কমপক্ষে ১৪টি বিমান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনতে পারে। 

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্কহার আরও ৩-৪ শতাংশ কমাতে রাজি হতে পারে। শুল্কহার কমানোর ঘোষণা আসতে পারে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি অথবা ৯ ফেব্রুয়ারি।

Advertisement
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ মূলত অর্থনীতিকেন্দ্রিক। এর আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের চাপ ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত। যদিও দুই প্রশাসনের চাপের ধরন ভিন্ন, মূল লক্ষ্য একই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। 

বাইডেন প্রশাসন কৌশলগতভাবে পদক্ষেপ নিলেও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। গত বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশকে বছরে ৫০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজি একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রফতানি কাউন্সিল (ইউএসএসইসি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ টন সয়াবিন আমদানি করেছে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩১০ শতাংশ বেশি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রয়াসে এই আমদানি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সরকার-টু-সরকার চুক্তির মাধ্যমে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি কার্যক্রম শুরু করছে। এ চুক্তির আওতায় মোট ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিকটন গম যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুটি চালানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৩ মেট্রিকটন এবং গত ৩১ জানুয়ারি তৃতীয় চালানে ৫৮ হাজার ৩৫৯ মেট্রিকটন গম দেশে এসেছে।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানিয়েছে, বাংলাদেশের তিনটি শীর্ষ সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ এবং ডেল্টা এগ্রো আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন ক্রয় করবে। এতে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যশিল্পে সরবরাহ চেইনে স্থিতিশীলতা আসবে। 

এ ছাড়া ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টার চালান। চট্টগ্রাম বন্দরে এ চালান স্বাগত জানানো হয়েছে। চালানটিতে ২০২৫-২৬ ফসল মৌসুমের নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ও মিনেসোটার উৎপাদিত ৫৭ হাজার ৮৫৫ মেট্রিকটন হলুদ ভুট্টা অন্তর্ভুক্ত। এতে বাংলাদেশের পশুখাদ্য প্রস্তুতকারকদের জন্য উচ্চমানের ভুট্টার একটি নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা খাদ্যশস্য রফতানির পাশাপাশি বোয়িং বিমান এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধ সরঞ্জাম বিক্রি করতে চায়। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ২০১৮ সালেই (বাইডেন প্রশাসনের আমলে) বাংলাদেশের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রির ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। 

গত ৮ বছর ধরে এই ইস্যুতে ওয়াশিংটন ঢাকাকে চাপে রেখেছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ ইস্যুতে চলমান ধারাবাহিক বৈঠক এখন শেষের স্তরে। দেশটি চায়, জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) এবং আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিং অ্যাগ্রিমেন্ট) নামের দুটি সামরিক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিক বাংলাদেশ। এ ইস্যুতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছেন।

এদিকে আমেরিকান বোয়িং কোম্পানি থেকে কমবেশি ১৪টি বিমান কিনতে যাচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনা প্রায় শেষের পথে। এমনও হতে পারে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে এ ইস্যুতে ঘোষণা আসতে পারে। তার আগে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার কমানোর ঘোষণা আসবে। ৪০ শতাংশ থেকে তিন দফায় দরকষাকষি করে শুল্কহার ২০ শতাংশে ঠেকেছে, যেখান থেকে আরও ৩-৪ শতাংশ কমানোর ঘোষণা আসতে পারে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন কেনাকাটার ফলেই তারা এই শুল্কহার কমাতে রাজি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০৬০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ২২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য শুল্ক ইস্যুতে রোববার সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুল্ক কমানো ইস্যুতে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা আসবে, এটা আমার বলা উচিত নয়। এ বিষয়ে এখনও দরকষাকষি চলছে। চূড়ান্ত হলে অবশ্যই আপনারা জানবেন। এটা কঠিন, কারণ ৯ ফেব্রুয়ারি না হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারিও হতে পারে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন রোববার সাংবাদিকদের জানান, শুল্ক কমানো এবং বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে দরকষাকষি চলছে। তিনি বলেন, বিমানের অবস্থা খুবই খারাপ, নতুন এয়ারক্রাফট দরকার। চারটি বিমান লিজে পাওয়া সম্ভব হবে। দরকষাকষি দ্রুত সমাধান হবে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান রোববার সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি আমরা ডেট পেয়েছি। এ ব্যাপারে চুক্তির খসড়া এবং এই তারিখেই সই করার জন্য একটা অনুমোদন চেয়ে আমরা সামারি পাঠিয়েছি। এটা এলে পরে আমরা চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। বাংলাদেশের পারস্পরিক শুল্কহার ২০ শতাংশ আছে। অন্যান্য দেশে একই আছে। আবার কিছু দেশে বেশি আছে। তবে আমরা আশা করছি হয়তো আরও কিছু কমতেও পারে। সে ধরনের একটা ধারণা আছে। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এখনও নিশ্চিত হয়নি। আমরা চুক্তির খসড়া করেছি, তবে চূড়ান্ত শুল্ক কত হবে সেটি ৯ তারিখের আগপর্যন্ত বলা যাবে না।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে এলএনজি, সয়াবিন, গম ও ভুট্টা সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি ও বাণিজ্য কার্যক্রম বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্প ও সামরিক আধুনিকীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ের আলো/এআর
  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  নির্বাচন  বাণিজ্য  চুক্তি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: