প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৫ এএম
তদারকির অভাব ও বেপরোয়া নিধনে হারিয়ে যাওয়া হাকালুকি হাওড়ের জলাবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। ছবি : সংগৃহীত হাকালুকি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির হাওড়। হাকালুকি হাওড়ে একসময় প্রচুর জলাবন ছিল। সেগুলো বন বিভাগের আওতায় ছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের আওতা থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে হাওড়ের ভূমির দায়িত্ব চলে যায়। এরপর প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবের পাশাপাশি মানুষের বেপরোয়া জলাবন নিধন এবং বন কেটে জমি তৈরির কারণে আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে থাকে হাওড়ের জলজ বনগুলো। শুধু উদ্ভিদ নয়, হাওড় তীরের মানুষের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে হুমকির মুখে পড়ে পরিবেশ।
১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওড়কে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা ইসিএ) এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হাকালুকি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জলাবন পুনরুদ্ধারে নেওয়া হয়েছে প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় হাকালুকির উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রোপণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০০ জলজ গাছের চারা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে হাওড়ে মাছ ও অতিথি পাখিদের অভয়াশ্রম গড়ে উঠবে। এমনকি এসব জলাবন বা সোয়াম ফরেস্ট প্রকৃতিপ্রেমীদেরও কাছে টানবে। ফলে পর্যটনের পরিধি বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে হাওড় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন সাধিত হবে।
সম্প্রতি হাকালুকি হাওড়ের বিভিন্ন এলাকায় জলজ উদ্ভিদের চারা লাগানো হয়েছে। সেগুলো হলো, কুলাউড়া উপজেলার নাগুয়া-লরিবাই বিলের কান্দায় ৫ হাজার, জুড়ী উপজেলার চাতলা, নামা তরুল, নাগুয়া-ধলিয়া বিলের কান্দায় ১৪ হাজার ৫০০, বড়লেখা উপজেলার জল্লা ও মালাম বিলের কান্দায় ১৫ হাজার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিরালী খালের পাড়ে ৫ হাজার হিজল, করচ ও বরুন গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব চারা রক্ষায় ৮ জন পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে গরু-মহিষের দ্বারা ক্ষতি থেকে রক্ষায় দেওয়া হয়েছে বাঁশের বেড়া।
সরেজমিন হাকালুকি হাওড়ে দেখা যায়, নতুন সৃজিত জলজ গাছের চারা নতুন কুড়ি মেলেছে। আসছে বর্ষা মৌসুমের আগেই চারাগুলো ডালপালা মেলতে শুরু করবে। বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে গেলেও চারাগুলো মরবে না বলে জানান চারা লাগানোর কাজে নিয়োজিতরা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বলেন, এসব জলজ বন সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে ‘নবপল্লব’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ জন পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সেই সঙ্গে হাকালুকি হাওড়ে জলজ বনের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন বিল ও খালের কান্দায় ৩৯ হাজার ৫০০ হিজল, করচ ও বরুন গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে হাকালুকি হাওড় বর্ষায় মাছ এবং শীতকালে অতিথি পাখির অভয়াশ্রম হবে। সর্বোপরি হাওড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে আসবে বলেও মন্তব্য করেন প্রকল্প কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, হাকালুকি হাওড় মূলত মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় অবস্থিত একটি বিশাল মিঠাপানির জলাভূমি যার আয়তন প্রায় ১৮১ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ১০০টি বিল নিয়ে গঠিত এই হাওড় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় এবং শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের অভয়ারণ্যে রূপ নেয়। ২০০০ সালে পরিবেশ অধিদফতর হাকালুকি হাওড়ে প্রথম উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
২০০৩ সালে হাকালুকি হাওড়ে পরিবেশ অধিদফতরের সিডব্লিউবিএমপি প্রকল্প চালু হওয়ার সময় মাত্র দুটি জায়গায় অল্প পরিমাণে হিজল ও করচের ছোট ছোট গাছ ছিল। পরবর্তী সময়ে পরিবেশ অধিদফতরের সিডব্লিউবিএমপি প্রকল্পের মাধ্যমে সিএনআরএস হাকালুকি হাওড়ের অনেক কান্দাতে হিজল ও করচের চারা রোপণ করে।
সেই সঙ্গে অনেক কান্দাকে সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। তারই প্রেক্ষিতে হাকালুকি হাওড়ের জল্লা বিল, মালাম বিল, সাতবিলা বিল, চৌলা বিল, পিংলা বিল, টোলার বিল, নাগুয়া-লরিবাই বিল, কাংলি বিল, শিংজুড়ি বিল, হাওয়া-বর্না বিল এবং কাটা গাং ও বিরালী খালের পাড়ে জলজ গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে উঠতে থাকে হিজল, করচ ও বরুন গাছের জলাবন যার আয়তন আনুমানিক ১৬০ হেক্টর।
সময়ের আলো/এআর