প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৬ এএম আপডেট: ০২.০২.২০২৬ ৩:১৪ এএম
মোটরসাইকেলে প্ল্যাকার্ড নিয়ে হ্যান্ডমাইকে ভোট প্রার্থনা করছেন গাইবান্ধা-১ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) মনোনীত তরুণ প্রার্থী পরমানন্দ দাস। ছবি : সময়ের আলোগাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে শনিবার বিকালের বাতাসে ছিল অন্যরকম এক নির্বাচনি সুর। বাজারের কোলাহলের মাঝখানে হঠাৎই ভেসে এলো হ্যান্ডমাইকের কণ্ঠ ভোটের আহ্বান, প্রতীকের পরিচয় আর তরুণ কণ্ঠের প্রত্যয়।
মোটরসাইকেলের পেছনে বাঁধা প্ল্যাকার্ড-নির্বাচনি প্রতীক চালকের আসনে বসে নিজেই ভোটারদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন বাসদ (মার্কসবাদী) মনোনীত তরুণ প্রার্থী পরমানন্দ দাস। গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের ভোটের মাঠে এই দৃশ্য যেন এবারের নির্বাচনের নতুন দৃশ্যপট।
এবারের নির্বাচনি প্রচার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় মাইকের ব্যবহার সীমিত আর পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ফলে চেনা পোস্টারে ঢাকা দেয়াল আর উচ্চস্বরে মাইকের বদলে প্রার্থীরা ঝুঁকছেন ঘরে ঘরে যোগাযোগ, উঠান বৈঠক আর সরাসরি গণসংযোগের দিকে। পরিবর্তনকে অনেকেই স্বাগত জানালেও প্রশ্ন উঠেছে এই বিধিনিষেধ কি সব প্রার্থীর জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে?
পোস্টারহীন প্রচার নতুন বাস্তবতা : সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-১ আসন বরাবরই স্থানীয় প্রভাবশালী ও গ্রামীণ নেতৃত্বের আধিপত্যের কেন্দ্র। তবে এবারের ভোটের মাঠে ছবিটা কিছুটা ভিন্ন। পোস্টার না থাকায় ভোটারদের সামনে প্রার্থীর মুখ-নাম-প্রতীক চেনানোর দায়িত্বটাই যেন প্রার্থীদের কাঁধে এসে পড়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচয় দেওয়া, উঠান বৈঠকে কথা বলা, নারী ও তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সব মিলিয়ে প্রচার সময়সাপেক্ষ হলেও মানবিক সংযোগটা বেড়েছে। প্রার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, পোস্টার থাকলে কাজটা সহজ হতো। আবার অনেকে মনে করছেন, এই পদ্ধতিতে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্কটা আরও কাছের হয়ে উঠছে।
শিক্ষিত প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা : হলফনামা অনুযায়ী এবারের প্রার্থীদের তালিকায় ব্যারিস্টার, চিকিৎসক, অধ্যাপকসহ উচ্চ শিক্ষিত পেশাজীবীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী (ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল), খন্দকার জিয়াউল ইসলাম (অর্থোপেডিক চিকিৎসক), মো. মাজেদুর রহমান (অধ্যাপক) জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এই তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে মাঠে আছেন তরুণ ছাত্রনেতা পরমানন্দ দাস (এলএলবি ও এমএসএস)। বিশ্লেষকদের মতে, ৩৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে বয়সসীমায় এই প্রার্থীরা তরুণ শক্তি আর অভিজ্ঞতার এক ধরনের সমন্বয় তুলে ধরছেন। ভোটারদের কাছে এটি শুধু ব্যক্তির লড়াই নয় বরং আইনসভায় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় শিক্ষিত কণ্ঠের সম্ভাবনাও।
বাজারে ভোটের আমেজ : মীরগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী বিকাশ সরকার বলেন, আগে পোস্টারে প্রার্থীর নাম, দল আর মার্কা দেখা যেত। এবার পোস্টার না থাকায় ভোটের মাঠটা একটু নিরুত্তাপ লাগে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চাকরিজীবী মো. জোবায়ের হোসেনের মত ভিন্ন। তার ভাষায়, ভোটের আমেজ কমেছে ঠিকই, কিন্তু দেয়াল আর বাড়িঘর নষ্ট হওয়া বন্ধ হয়েছে। এ দিকটা ভালো। পরমানন্দ দাসের ব্যতিক্রমী প্রচার অনেকের চোখে আশার প্রতীক। বাজারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ ভোটার সাহিদ হোসেন শান্ত জানান, প্রার্থী নিজে এসে কথা বলছেন এটিই আলাদা। মনে হয় আমাদের কথাও তিনি শুনবেন।
হেভিওয়েটদের গাড়ির বহর, বামরা পায়ে হেঁটে : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গাইবান্ধায় প্রচারে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। বড় দল ও হেভিওয়েট প্রার্থীরা গাড়ির বহর, মাইকিং ও ডিজিটাল প্রচারে মাঠ দাপাচ্ছেন। বিপরীতে সিপিবি ও বাসদ (মার্কসবাদী)সহ বামপন্থি দলগুলো সীমিত সামর্থ্য নিয়ে পায়ে হেঁটে লিফলেট বিতরণ ও ছোট পথসভার মধ্য দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন।
বাম নেতারা বলছেন, আদর্শ ও কর্মী শক্তিই তাদের ভরসা। অন্যদিকে বড় দলগুলোর মতে, আধুনিক প্রচার সময়ের দাবি। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈপরীত্য নির্বাচনি রাজনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। একদিকে অর্থ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার, অন্যদিকে আদর্শনির্ভর মাঠ রাজনীতি দুই ধারার এই লড়াই ভোটের মাঠকে করে তুলেছে বৈচিত্র্যময়।
প্রার্থীর কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি : পরমানন্দ দাস বলেন, আমরা প্রচারে বিলাসিতা করি না। আর্থিক সামর্থ্যরে অভাব থাকলেও মানুষের কাছে গিয়ে কথা বলাই আমাদের রাজনীতির মূল শক্তি। এবারের নির্বাচন অন্যরকম। পোস্টার নেই, তাই ঘরে ঘরে যেতে হচ্ছে। কষ্ট আছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনে চলাই দায়িত্ব। যেহেতু সবার জন্য একই নিয়ম, আমিও তা মেনেই প্রচার চালাচ্ছি।
সরেজমিন কথা হয় স্থানীয় বেশ কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। এ সময় তারা মন্তব্য করেন, গাইবান্ধা-১ আসনের ভোটের মাঠে এবারের ছবি শুধু প্রতীকের লড়াই নয়, এ যেন মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের নতুন অধ্যায়। পোস্টারহীন দেয়ালে, মাইকের সীমিত শব্দে, উঠান বৈঠকের আলোচনায় আর বাজারের কোলাহলে তৈরি হচ্ছে ভোটের গল্প যেখানে প্রার্থীর মুখোমুখি উপস্থিতিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রচার।
তারা আরও মন্তব্য করেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে প্রচারের গতি। তবে ভোটারদের কাছে শেষ পর্যন্ত কোন ধারা কতটা প্রভাব ফেলবে সেই সিদ্ধান্ত দেবে ব্যালটের রায়।
সময়ের আলো/এআর