ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৮ দিন। নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সূক্ষ্ম কারচুপির ষড়যন্ত্রের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত। একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত দুই পক্ষই প্রশাসনকে নিজেদের প্রভাবাধীন বলে অভিযোগ তুলছে। তবে ২০১৮ সালের মতো একমুখী প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবার নেই বলে মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রশাসনের ভেতর দ্বিমুখী রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় ঢালাও কারচুপির সুযোগ কমেছে।
তবে জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৮ সালের মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটে নজিরবিহীন কারচুপি করার সুযোগ এবার নেই। কারণ ওইসময়ে পুরো জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ছিল একমুখী অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এবার প্রশাসন একমুখী নয়। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকার অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কোনো দল বা গোষ্ঠী ভোটে বড় ধরনের কারচুপি করতে পারবে না। তা ছাড়া এবার মাঠে দুই পক্ষই শক্ত অবস্থানে থাকায় কারচুপি করতে গেলে বাধার মুখে পড়বে। তবে সুষ্ঠু ভোটের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
নির্বাচন পরিচালনায় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা। আর এই দায়িত্ব মূলত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরাই পালন করেন। তাদের সহযোগিতা করেন এসপি ও ওসিরা। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য নিয়োগ পাওয়া ৬৯ রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র তিনজন। আর বাকি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জন জেলা প্রশাসক। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে জয়ী করার জন্য দিনের ভোট আগের রাতে হওয়ার সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই অপরাধে গত বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে থাকা প্রশাসনের ৩৩ জন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তারা ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়া তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, এমন অন্তত ২২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপির ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এবারের ভোটে ঢালাও কারচুপির সুযোগ তেমন একটা থাকবে না। কারণ ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দুই প্রতিপক্ষ যেমন শক্ত অবস্থানে রয়েছে তেমনি কর্মকর্তাদের মধ্যেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থিরা সক্রিয় রয়েছেন। মাঠ প্রশাসনে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা এবং এসপি ও ওসিরাও সবাই একটি দলের পক্ষে নয়। ফলে কোনো কর্মকর্তা চাইলেই কোনো বিশেষ দলের পক্ষে ভোট কারচুপির সুযোগ পাবেন না। যেটা ২০১৮ সালের ভোটে ছিল না। তখন কর্মকর্তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলকে খুশি করার জন্য আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল।
এবার বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করে একতরফা ভাবে ঢালাও কারচুপি করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এবার ঢালাও কারচুপি না হলেও কিছুটা পক্ষপাতিত্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে যে দল প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে তারা সেখানে কারচুপির চেষ্টা করবে। আর আমলারা হাওয়ার অনুকূলে পাল তুলবে। বিগত ভোটে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে আমলারা একটা চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে এবার হয়তো তারা জোরালোভাবে দলীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। এ কারণে নির্বাচন এবার একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারের কোনো ইঙ্গিত যদি আমলাদের ওপর না থাকে তা হলে ভোট নিরপেক্ষ হবে। আর গোপনে কোনো সিদ্ধান্ত হলেও এবার ডিসি, ইউএনও এবং এসপি ওসিরা সরাসরি কোনো দলের পক্ষে ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ফিরোজ মিয়া বলেন, এবার ভোট নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো। যারা যেখানে শক্তিশালী সেখানে তারা প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতা দেখাতে গিয়ে নির্লিপ্ত হয়ে যায় তা হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকও মনে করেন এবার ভোটে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপির সুযোগ নেই। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এবার কোনো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন হচ্ছে না। দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় ভোটে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। তা ছাড়া ভোটের সময় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ দলের পক্ষে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রশাসন সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়। ফলে এবারের ভোটে দিনের ভোট রাতে কিংবা ঢালাও কারচুরি সুযোগ কোনো পক্ষ পাবে না। তবে প্রশাসনের লোকজন যদি মনে করে কোনো একটি দল ভোটে জিতে যাচ্ছে তা হলে হয়তো কর্মকর্তারা সেই দলের পক্ষে থাকতে চাইবে। ওই দলের বিপক্ষে জোরালো ভূমিকা নাও নিতে পারে ভোটের পরে যাতে তিনি ভালো পদায়ন পান তা ভেবে। যে দল জয়ী হবে সেই দলের প্রার্থীকে হয়তো ভোটের দিনে রাগাতে চাইবে না কর্মকর্তারা। তবে ২০১৮ সালের মতো আগে ব্যালট দেবে না এবার। তিনি বলেন, এবার সবাই ভোটের দিন কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করবে। যারা সৎলোকের শাসনের কথা বলছে তারাও ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য চাইবে কেন্দ্র দখলে রাখতে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসন ও পুলিশ কঠোর ভূমিকা পালন করলে এবারের ভোট তুলনামুলক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে তিনি মনে করেন।
কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমীন টুলী বলেন, ভালো নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলের এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে। তারা যদি নির্বাচনকে ঝামেলায় না ফেলতে চায়, নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের হানাহানি বা ভোটকেন্দ্র দখল বা ভোটারকে বাধা দেওয়া বা কোনো প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করা, তার প্রচারে বা কোনো রাজনৈতিক দল আরেকটার বিরুদ্ধে এআই ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়াতে বড় ধরনের কোনো ডিজাস্টার না করে ফেলে। যদি সত্যিই আমরা ভালো নির্বাচন করতে চাই, সরকারের সহযোগিতা যেমন দরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং যারা ভোটকেন্দ্রে কাজ করবে তারা এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে যারা কাজ করছে।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়সহ দেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোযোগ এখন মূলত নির্বাচনি হিসাব-নিকাশের দিকে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ৯ থেকে ১০ দিন বাকি। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকায় রুটিন কাজের বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক তৎপরতা সীমিত করেছে মন্ত্রণালয়গুলো। নির্বাচনকালে এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু রুটিন কাজ করে সময় পার করছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়গুলোতে তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। তপসিলের পর খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রদবদল বন্ধ থাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দর্শনার্থী বা তদবির নিয়ে কোনো ভিড় নেই। নিয়মিত কাজের বাইরে বাড়তি চাপ না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কাজের চেয়ে নির্বাচনের খোঁজ বেশি রাখছেন। নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় আছেন তারা। ফলে সচিবালয় এখন অনেকটাই ‘প্রাণহীন’।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনের প্রায় সব স্তরে নির্বাচনি প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারের নিয়মিত অন্যান্য কার্যক্রমে এক ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা এখন মূলত নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। বড় কোনো নতুন প্রকল্প বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখন আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এমনকি চলমান সংস্কার কার্যক্রমের গতিও আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে সরকারের নির্দেশনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণভোটে জনসচেতনা বাড়াতে প্রচারকাজে সম্পৃক্ত করায় তাদের নিয়মিত কাজের পরিধি ও ব্যস্ততা বাড়লেও মূল প্রশাসনিক কাজগুলো অবহেলিত হচ্ছে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বুঝতে পেরেছেন যে নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকার আসছে। তখন প্রশাসনিক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমান সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ-পরবর্তী সময়ে বহাল নাও থাকতে পারে। এ কারণে অনেকেই কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। রুটিন কাজের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। মূলত পরবর্তী সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতেই তারা এই পথ অবলম্বন করছেন। তবে নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন রুটিন কাজগুলো নিয়মিত চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক কার্যক্রম ঢিলেঢালা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে রুটিন কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, এই মুহূর্তে প্রশাসনের মূল মনোযোগ নির্বাচনের দিকে। নির্বাচনের ডামাডোলে অন্য কাজগুলো কিছুটা পেছনে পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনের পর একটি নতুন নিয়মিত সরকার আসবে। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের রুটিন কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন।