দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর খুলনায় নির্বাচনি জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর কড়া সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে ইঙ্গিত করে তীব্র বিষোদগার করেছেন। তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল নারী সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করেছে। ওই দলের নেতা নারীদের খারাপ ভাষায় অপমানিত করেছেন। তারা কোনোভাবেই নারী নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না।
নির্বাচন নিয়ে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে মন্তব্য দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। ধানের শীষে ভোট চেয়ে খুলনাকে জীবিত শিল্পনগরীতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সোমবার দুপুরে খালিশপুরের প্রভাতী স্কুল মাঠে এক সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে খুলনায় পৌঁছে হেলিপ্যাড থেকে মাঠে আসেন দুপুর ১২টা ২৪ মিনিটে। ৩৮ মিনিটে বক্তব্য রাখেন বিএনপির চেয়ারম্যান। বক্তব্যের প্রায় আধাঘণ্টা জামায়াতের সমালোচনা করেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তিনি হেলিপ্যাডের উদ্দেশে রওনা হন। সেখান থেকে যশোরে যান বিএনপি চেয়ারম্যান।
নির্বাচনি প্রচার মঞ্চে প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে তারেক রহমান ধানের শীষে ভোট চান। দুই পাশে ধানের শীষ হাতে প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে তিনি বলেন, এই মানুষগুলোকে ১২ তারিখ পর্যন্ত দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। বাকিটা সময় এলাকার উন্নয়ন, সমস্যা-অসুবিধা সবকিছু দায়দায়িত্ব তাদের।
তারেক রহমান বলেন, একটি মহল বলার চেষ্টা করছে, এবার ভোট গণনায় নাকি অনেক সময় লাগবে। ষড়যন্ত্র আবার শুরু করেছে। যারা জনগণের সামনে সকাল-বিকাল মিথ্যা কথা বলছে, যারা দেশের নারী সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করছে, তারা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তাদের এসব কথাবার্তা, তাদের এসব কাজকর্ম, এসব ফাঁকি-ঝুঁকি মানুষ ধরে ফেলেছে। সে জন্য তারা বিভিন্ন ছলচাতুরীর চেষ্টা করছে। এ জন্য দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে তার মধ্যে একমাত্র বিএনপির অভিজ্ঞতা আছে দেশ পরিচালনার। যেহেতু বিএনপির অভিজ্ঞতা আছে দেশ পরিচালনা করার সেহেতু একমাত্র বিএনপির পক্ষে সম্ভব এ বাংলাদেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করার। তিনি বলেন, সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে হলে দুটি বিষয় নজর দিতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, যেন মানুষ শান্তিতে রাজপথে চলতে পারে, যেন মানুষ শান্তিতে তার ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, যেন মানুষ রাতে ঘুমাতে পারে তার নিজের ঘরে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সমাজ। এ নারী সমাজকে পেছনে রেখে যতই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করি না কেন, যতই বড় বড় কথা বলি না কেন কোনোভাবে সম্ভব নয় দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়া, দেশকে পুনর্গঠন করা। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল এই যে দেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠী সম্পর্কে...কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায় সেই কথা তারা বলেছে। আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন যে, তারা কোনোভাবেই নারী নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন না। আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা দুদিন আগে বলেছেন, যেসব মা-বোন কর্মসংস্থানের জন্য যান, তাদের...আপনাদের সামনে আমার রীতিমতো লজ্জা হচ্ছে...এমন একটি শব্দ সে আমাদের মা-বোনদের জন্য ব্যবহার করেছে যা এ দেশের জন্য কলঙ্কস্বরূপ। এই বাংলাদেশে খেটে খাওয়া মানুষের পরিবারের অধিকাংশ নারী সংসারের উপার্জনের জন্য কাজ করে থাকেন, এই বাংলাদেশের ৫০ লাখের ওপরের নারী আজ...যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে সবার গৌরব করে সেই গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিকরা কাজ করেন। কিন্তু আজ আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা কীভাবে নারী সমাজকে খারাপ ভাষায় অসম্মানিত করেছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এরা শুধু নিজের স্বার্থের কথা বোঝে। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। যেখানে প্রয়োজন সেখানে তারা তাদের মতো করে ধর্মকে ব্যবহার করে। আমরা দেখেছি, যখন এই কথা (জামায়াত আমিরের কথা) বলার পরে তীব্র সমালোচনা শুরু হলো নারী সমাজ থেকে, যখন এই কথা বলার পরে তীব্র সমালোচনা শুরু হলো সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে তখন তারা বলছেন, তাদের এই আইডি নাকি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে যে, আইডি এভাবে হ্যাক হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দলের একজন সিনিয়র নেতা জনগণের সামনে নির্বাচনের আগে এভাবে মিথ্যা কথা বলছেন, দলটি পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলছে যে, তাদের আইডি বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। অথচ আইডি হ্যাক হয়নি তাদের। এরা নির্বাচনের আগে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্য মানুষের সামনে মিথ্যা কথা তুলে ধরছে, মিথ্যা কথা বলছে। এদের একটাই পরিচয় এরা মিথ্যাবাদী।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী সমাজকে পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে জন্য নির্বাচনে জয়ী হলে আমরা প্রতিটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। এই কার্ডের মাধ্যমে আমরা দেশের নারী সমাজকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। যাতে এই নারী সমাজ কারও মুখাপেক্ষী না হতে হয়, যাতে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই যাদের কাছে মানুষের মূল্যায়ন নেই, যাদের কাছে মানুষের আত্মসম্মানবোধ নেই তাদের কাছে কখন দেশ নিরাপদ হতে পারে না, মানুষ নিরাপদ হতে পারে না, নারীরা নিরাপদ হতে পারে না।
খুলনা শিল্পনগরী গ্যাসসহ নানা সমস্যার কারণে মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খুলনাকে জীবিত শিল্পনগরীতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। খুলনা মহানগরের সভাপতি শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের সঞ্চালনায় খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ১৪ জন প্রার্থীসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা বক্তব্য রাখেন।
যা বললেন খুলনার সাধারণ মানুষ : সমাবেশে আসা খুলনা অঞ্চলের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বলেছেন, তাদের চাওয়া যাতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা জুটমিলস চালুর বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে। শিল্প-বাণিজ্যের নগরী খুলনাকে পুরোনো চিত্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। তারা বলেন, খুলনায় বেকারত্ব বড় সমস্যা। কলকারখানা প্রায় সব বন্ধ। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে এগুলো খোলার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাবেশ স্থলের একটু দূরে খালিশপুর এলাকায় কথা হয় স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ী মনসুর আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের চাওয়া বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে তারা জুটমিল খুলে দেওয়ার বিষয়ে সত্যিকার অর্থে কাজ করবে। আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি না, দৃশ্যমান কাজ দেখতে চাই।
স্থানীয় মানুষজন বলছেন, একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা এখন বেকারদের নগরী। খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টিসহ বন্ধ সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সরকারি মালিকানায় চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে নাগরিক ও শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি সংগঠন। খুলনার রাজপথে এখনও তারা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ জুলাই খুলনার ৯টিসহ মোট ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। কর্মকর্তা-কর্মচারী বাদে এসব কারখানার ৩৩ হাজারের বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। খুলনার ৯টি পাটকলের জমির পরিমাণ ৫১৬ একর। এর মধ্যে ২৮৮ একর ইজারা দেওয়া হয়েছে বা ইজারা প্রক্রিয়াধীন।
চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে চাই : পরে বিকালে যশোরের জনসভায় তারেক রহমান বলেন, আগস্টের পর ভেবেছিলাম রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে; কিন্তু হয়নি। একটি রাজনৈতিক দল মা ও নারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা শুরু করেছে। ১২ তারিখ নির্বাচিত হলে ফের খাল খনন করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান।
যশোর এলাকা নিয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এই শহরের ফুল চাষ শিল্প পর্যায়ে আনতে চাই; বিদেশে রফতানি করতে চাই। যশোরের আখ চাষ সুনাম আছে; আমরা চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে চাই।
এবারই প্রথম নির্বাচনি প্রচারাভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করলেন তারেক রহমান। এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠ থেকে নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু করেন। সেদিন তিনি মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনি সমাবেশ করেন।
এরপর ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে প্রচারাভিযান শুরু করেন তারেক রহমান। সেখান থেকে তিনি ফেনী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, সোনাগাজী, দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনি সমাবেশ করে ঢাকায় ফেরেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান উত্তরাঞ্চল সফর শুরু করেন ২৯ জানুয়ারি। তিন দিনের সেই সফরে তিনি রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে নির্বাচনি সমাবেশ শেষে ঢাকায় ফেরেন শনিবার। ২২ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২২টি নির্বাচনি সমাবেশে করেছেন তারেক রহমান।