ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এই বিক্ষোভ মার্কিন সেনাদের হাতে মাদুরো দম্পতির অপহরণের এক মাস পূর্ণ হওয়া উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গ্রান্ড মার্চ’ বা ‘মহাসমাবেশ’।
গত ৩ জানুয়ারি এক রাতে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। এই ঘটনা ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এক বিরল ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। বিক্ষোভকারীরা ‘ভেনেজুয়েলার জন্য নিকোলাসকে প্রয়োজন’ স্লোগান দিয়ে তাদের দ্রুত দেশে ফেরানোর দাবি জানান। এছাড়া, তারা প্রেসিডেন্টের ছবি সম্বলিত ব্যানার, পোস্টার এবং টিশার্ট ধারণ করেন, যা কারাকাসের রাস্তায় শক্তিশালী দৃশ্য তৈরি করে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মাদুরোর ছেলে এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য নিকোলাস মাদুরো গুয়েরা। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমার পিতাকে বিদেশি সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে আজীবন এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং পবিত্র মাটিতে বিদেশি শক্তির অনধিকার প্রবেশ।
সরকারি আহ্বানে আয়োজিত পদযাত্রায় বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারীও অংশ নেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভকে ‘বৈশ্বিক প্রতিবাদ দিবস’-এর অংশ হিসেবে আয়োজিত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংহতি প্রকাশকারীরা ‘ভেনেজুয়েলা থেকে হাত তোলো’ স্লোগান দিয়ে মাদুরো দম্পতির আটকাদেশকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেলসি রদ্রিগেজ। তিনি মাদুরো সমর্থকদের শান্ত রাখা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া শর্তের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের খনির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে তিনি রদ্রিগেজ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হবেন। এ প্রেক্ষিতে রদ্রিগেজ প্রশাসন কয়েকশ রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে এবং জাতীয়করণ করা জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পথ খুলে দিয়েছে।
একই দিনে কারাকাসে আরও একটি পৃথক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক বন্দিদের স্বজনরা অংশ নেন। তারা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমা আইন দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান। যদিও রদ্রিগেজ প্রশাসন এই আইনের প্রবর্তনের অঙ্গীকার করেছিল, তবে তা এখনও পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়নি।
মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার রাজনীতি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। জনমত এবং বিক্ষোভের চাপের কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। দেশটির সাধারণ মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সংগ্রাম করতে বাধ্য, যেখানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন প্রশাসনের চাপ দেশটির স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার সংকট কেবল দেশীয় রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাদুরো দম্পতির মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।
/ইউএমএইচ