ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো পার্বত্য জেলা বান্দরবানেও ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনি আমেজ। পাহাড়, বন ও নদীবেষ্টিত পর্যটন নগরী বান্দরবান বরাবরই বহু সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি অনন্য জনপদ। মারমা, চাকমা, ম্রো, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, লুসাই, খেয়াং, পাংখোয়া, চাক ও বাঙালিসহ ১২টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এই জেলায়। এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বাড়তি আগ্রহ ও প্রত্যাশা।
বান্দরবান-৩০০ আসনে এবারের নির্বাচনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে সাচিং প্রু জেরী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন, জাতীয় পার্টি (কাদের) থেকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু জাফর মো. ওয়ালীউল্লাহ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ। প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির সাচিং প্রু জেরী ছাড়া অন্য তিনজনই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচার-প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী ও এনসিপি প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি (কাদের) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার সাধারণ ভোটারদের চোখে তেমন দৃশ্যমান নয় বলে মত দিয়েছেন অনেকে। বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাসকারী এই পার্বত্য জেলায় ভোটারদের প্রত্যাশা যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ এবং পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়ন এ বিষয়গুলোই ভোটারদের প্রধান চাওয়া।
তরুণ ভোটার সুচিত্রা তংচঙ্গ্যা বলেন, বান্দরবান দেশের অন্য জেলার মতো নয়। এখানে বহুজাতিক বাস্তবতা রয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে অবশ্যই এ বাস্তবতা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থানীয় ভোটার মং হাই থুই মারমা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনও মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বড় ঘাটতি রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় সমস্যা। এসব বিষয়ে যিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন তাকেই আমরা নির্বাচিত করতে চাই। আরেক ভোটার মামুনুর রশীদ বলেন, বান্দরবানের পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরিকল্পিত পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়ন দুটোই সম্ভব।
ইতিমধ্যে বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরি ও তার দলের নেতাকর্মীরা রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, আলীকদম ও লামাসহ বান্দরবান জেলার প্রায় সব উপজেলায় ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় আয়োজিত জনসভা ও পথসভায় তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে ভোটারদের সমর্থন কামনা করছেন। অন্যদিকে এনসিপির প্রার্থীও প্রচারে পিছিয়ে নেই। তিনি বান্দরবান সদর, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও থানচির বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছেন। এ সময় তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।
বান্দরবানের বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী জানান, জেলার প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচনি প্রচারে তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষ্যেই তিনি নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার কথা শুনছেন বলেও জানান তিনি। সাচিং প্রু জেরী বলেন, বিএনপি সবসময় পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে বান্দরবানের মতো পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সাচিং প্রু জেরী আরও বলেন, এ অঞ্চলের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দলীয়ভাবে সুসমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন জানান, ভোটারদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। তার কথায়, মানুষ এখন বিকল্প নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই জনসমর্থন যদি শেষ পর্যন্ত ভোটে প্রতিফলিত হয় তা হলে এনসিপির জন্য একটি বড় অগ্রগতি হবে এবং জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করবে। তরুণদের নিয়ে বান্দরবানে অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে যা বিগত সরকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তাদের হাতেই গড়ে উঠবে। তাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তরুণদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খেলাধুলার আয়োজন এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে পরিবার ও দেশের অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই নিশ্চিত হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা। দুর্গম এলাকায় প্রচার কিছুটা চ্যালেঞ্জ হলেও শেষ পর্যন্ত সব এলাকা কাভার করার চেষ্টা করছি।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, বান্দরবানের সবচেয়ে বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। এটিকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অবস্থান এখনও বেশ শক্ত। তাদের রয়েছে নিজস্ব ও প্রভাবশালী ভোটব্যাংক। তবে এবারের নির্বাচনে পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো নেতা বা সংগঠন কাকে সমর্থন করবে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে তাদের সমর্থক ভোটগুলো শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে তা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানা আলোচনা ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৭ জন। এবার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৯ জন। জেলার সাতটি উপজেলা, দুটি পৌরসভা ও ৩৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৮৬টি। এর মধ্যে ৩৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সময়ের আলো/আআ