মো. জুনাব আলী ও তার স্ত্রী হামিদা বেগমের বাড়ি জামালপুরে। জীবিকার তাগিদে এই দম্পতি জাতীয় সংসদ ভবনের রাস্তার পাশে চুড়ি বিক্রি করে। তবে তারা দুজনই জামালপুরের ভোটার। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা হলে তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তাই তাদের প্রধান ভাবনা।
জুনাব আলী জানান, তিনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থক। তার বিশ্বাস, পছন্দের দলটি ক্ষমতায় এলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। হামিদা বেগমও একই প্রত্যাশার কথা জানান। তিনি জানান, ভোট দিতে এবার তারা দুজনই বাড়ি যাবেন।
গত সোম, মঙ্গল ও বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শ্রমজীবী মানুষের নির্বাচনি ভাবনা ও চেষ্টা করে সময়ের আলো।
রিকশাচালক থেকে শুরু করে ফুচকা, বাদাম, চানাচুর, ঝালমুড়ি, ডাব, ফল ও সবজি বিক্রেতা, ঘড়ি মেরামতকারী, ফুটপাথের কাপড় ও চশমা ব্যবসায়ী, চা দোকানি, সিম কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।
আলোচনায় অংশ নেওয়া শ্রমজীবীদের অধিকাংশই বলেন, তারা এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে চান। এ লক্ষ্যে নিজ নিজ এলাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তবে ভোট দেওয়ার আগ্রহ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সার্বিক নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে তাদের অনেকের শঙ্কা এখনও কাটেনি।
তারা চান, যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক, নির্বাচনের আগে ও পরে যেন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
সংসদ ভবনের রাস্তার পাশে একাধিক ফুচকার দোকান রয়েছে। সেখানে কথা হয় ফুচকা বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা যেভাবে মানুষের সঙ্গে মিশে যান, নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি অন্তত ছয় মাস পরপর একদিন মানুষের খোঁজ নিতেন, তা হলে সাধারণ মানুষ অনেক খুশি হতো। এতে প্রতিনিধিদের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমত।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে উঠান বৈঠক বা মতবিনিময় সভা করা যেতে পারে। আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা সময় দিয়ে এমপি এলাকার সমস্যা শুনতে পারেন। কোথায় কী অনিয়ম হচ্ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কী করছেন, এসব জানা জরুরি। এখন দেখা যায়, এমপির নাম ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালীরা বিচার-সালিশ পর্যন্ত করে ফেলেন। এতে শেষ পর্যন্ত বদনামটা পড়ে এমপি ও দলের ওপরই।
সাইফুল ইসলামের দোকানের পাশেই চা বিক্রি করেন জসিম উদ্দিন। তার কথায় উঠে আসে শ্রমজীবীদের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব চিত্র।
তিনি বলেন, কথা বললেও ঝামেলার ভয় আছে। একজনের পক্ষে কথা বললে আরেক পক্ষের লোকেরা সমস্যা করতে পারে। আমরা হকার মানুষ, ছোট ব্যবসা করে খাই। ঝামেলা চাই না।
আসাদ গেট বাস স্টপেজের সামনে রিকশাচালক আবু কালামের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি জানান, তার বাড়ি মাদারীপুরে। ঘরে তিনটি ভোট আছে। ভাড়া জোগাড় করতে পারলে ভোট দিতে বাড়ি যাবেন।
টাউন হল মার্কেটে ঘড়ি মেরামত করেন ইসমাইল হোসেন।
তিনি বলেন, ভোটের প্রচার হচ্ছে, তবে আগের তুলনায় কম। তার প্রত্যাশা এলাকার শান্তি, দেশের শান্তি। যেই ক্ষমতায় আসুক, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগের সুরে ইসমাইল হোসেন বলেন, একজন মানুষ কি ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা নিয়ে নির্ভয়ে রাস্তায় চলাচল করতে পারে? পারে না। ছিনতাইকারী আর চাঁদাবাজদের লাগাম টানতেই হবে। যে সরকারই আসুক, এই কাজটা তাদের করতেই হবে।
ইসমাইলের দোকানের পাশেই টং দোকান চালান সোহাগ হাসান। তিনি জানান, ভোট দিতে এবার গ্রামে যাবেন এবং ধানের শীষে ভোট দেবেন।
টাউন হল সিঙ্গাপুর জুস বারের সামনে ডাব বিক্রি করেন তোফাজ্জল মিয়া। ঢাকার ভোটার তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ভোট দেওয়ার কথা জানান। তার প্রত্যাশা, দেশ ভালো থাকুক। মানুষ যেন দুই বেলা খেতে পারে।
টাউন হল কাঁচাবাজার সংলগ্ন রাস্তায় ফল বিক্রি করেন মো. শুক্কুর আলী। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। ভোট দিতে বাড়ি যাবেন। তবে কাকে ভোট দেবেন তা এখনও ঠিক করেননি। পোস্ট অফিস-সংলগ্ন রাস্তায় সবজি বিক্রেতা মো. নুরুজ্জামান জানান, ১০ তারিখ ভোট দিতে বাড়ি যাবেন। কাকে ভোট দেবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই। তার ভাষায়, আমরা গোষ্ঠীগতভাবে ভোট দিই।
একই এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করেন মিজানুর রহমান। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। তিনিও ভোট দিতে বাড়ি যাবেন।
তিনি বলেন, সরকারে কে এলো— সেটা বড় কথা নয়। এলাকার যে এমপি হবে, তিনি আসলেই ভালো মানুষ কি না, সেটাই দেখার বিষয়। তার চরিত্র, আচরণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছু বিচার করেই তিনি সিদ্ধান্ত নিতে চান।
ফার্মগেট তেজগাঁও কলেজ রোডে কাপড় বিক্রি করেন মহিউদ্দিন আহম্মদ।
তিনি জানান, তিনি এই এলাকার ভোটার এবং ১২ তারিখ অবশ্যই ভোট দেবেন। তার পাশেই চশমা বিক্রেতা মো. স্বপন জানান, তিনি চাঁদপুরের ভোটার। ৮ অথবা ১০ তারিখ ভোট দিতে এলাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কারওয়ান বাজারে বাদাম বিক্রি করেন আবু কাউসার। তার বাড়ি ভৈরবে। তিনি জানান, দুয়েক দিনের মধ্যে বাড়ি যাবেন এবং ভোট দেবেন। কোনো দল না করলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ তিনি মিস করেন না।
মগবাজারে চানাচুর বিক্রি করছিলেন সিরাজগঞ্জের জিয়াউল হক। তিনি জানান, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহেই বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন, তাই এবার ভোট দিতে যাবেন না। তবে তিনি চান, যে-ই ক্ষমতায় আসুক, দেশটা যেন ভালো করে চালায়। শুধু নিজের দলের নেতাকর্মীদের কথা না ভেবে সরকার যেন সবার কথা ভাবে।
শাহবাগ চত্বরে সিগারেট বিক্রি করেন সাইদুল মোল্লা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। মা ও স্ত্রী দুজনই গুরুতর অসুস্থ। ধানমন্ডির ভোটার হলেও ভোট দিতে পারবেন কি না, এ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান তিনি। তার ভাষায়, ভোট দেওয়া নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় সেই দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সেগুনবাগিচার তোপখানা রোডে মোবাইলের সিম বিক্রি করেন মো. রেজা। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জে। থাকেন শাহজাহানপুরে। ভোটারও ওই এলাকারই।
সিম কোম্পানির এই সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ বলেন, ভোট দিতে অবশ্যই যাব। ২০১৪ সালে তো কোনো ভোট-ই হয়নি। ২০১৮ সালে রাতে ভোট হইছে। আর ২০২৪ সালে আমি-ডামি। তাই এবার সুযোগ পাইলে অবশ্যই ভোট দেব।
এফআর