সহিংসতা রোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুসরণ করে নির্বাচনি কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী প্রয়োজনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে পারে বলে জানিয়েছেন সেনাসদরের সামরিক

2026-02-06T02:55:17+00:00
2026-02-06T02:55:17+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
সহিংসতা রোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি
নির্বাচন নিয়ে কঠোর বার্তা সেনাসদরের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৫ এএম 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গুলিস্তান জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে বাহিনীর সদস্যদের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ছবি : সময়ের আলো
‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুসরণ করে নির্বাচনি কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী প্রয়োজনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে পারে বলে জানিয়েছেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তানে রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কিত বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যালট বাক্স সুরক্ষায় প্রয়োজনে যেকোনো ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। এ লক্ষ্যে সারা দেশে লক্ষাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে যেখানে ৪০ থেকে ৪২ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করতেন, এবার প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে আমাদের সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরবর্তী এলাকায় অবস্থান করতেন। এবার ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি পর্যন্ত লক্ষাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করাই এর উদ্দেশ্য। তিনি জানান, এই মোতায়েন কার্যক্রম ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ জানুয়ারি থেকে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০ জানুয়ারি তা এক লাখে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায়, ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোয় মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান ও চেকপোস্টের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সেনাসদরের সংবাদ সম্মেলনের আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সমন্বয় সভায় অংশগ্রহণ নেন।

নির্বাচনি কেন্দ্রগুলোর অবস্থা বিবেচনায় অতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয় সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর রুলস অব এনগেজমেন্টটা কী হবে? বিজিবি বলেছে তারা কোনো অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করবে না। এ ক্ষেত্রে আপনারা কী করবেন জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে এনগেজমেন্ট বলে দেওয়া আছে। আমরা আইনের আওতায় থেকে সে রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুসরণ করে আমাদের দায়িত্ব পালন করে থাকি। যদি সত্যি সত্যি কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয় তা হলে রুলস অব এনগেজমেন্টে যে ক্রমান্বয়ে বল প্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির একটা প্রক্রিয়া আছে, সেটি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেনাবাহিনী কী করবে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর, এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। আইন অনুযায়ী যা করণীয়, তা করতে সেনাবাহিনী সর্বদা প্রস্তুত।

নির্বাচন-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংশয় দূর করার জন্যই সেনাবাহিনী প্রধান সব বিভাগে ব্যক্তিগতভাবে গেছেন এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা এই নির্বাচনের সঙ্গে নিয়োজিত থাকবেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। দুটো উদ্দেশ্য নিয়ে গেছেন। একটা হচ্ছে তাদের আস্থা দেওয়া, যেকোনো সহায়তা প্রদানের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত আছে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে জনগণকে আশ্বস্ত করা যেসব বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে প্রস্তুত।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সবসময় একটি সেনসেটিভ জায়গা এবং এ ব্যাপারে আপনারা জানেন যে শুধুই বর্তমানে নির্বাচনকেন্দ্রিক নয় নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ও আমরা ওখানে আমাদের সেনা মোতায়েন সার্বক্ষণিকভাবে থাকে। যেই আশঙ্কার কথা আপনি বলেছেন আমরা এগুলো আমাদের অ্যাসেসমেন্টের মধ্যে নিয়েছি।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের নিয়মিত টহল জারি থাকবে এবং এ কারণেই আমরা এবার উপজেলাভিত্তিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপন করেছি যাতে বিপুলসংখ্যক প্যাট্রোল একসঙ্গে বাইরে থাকতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষের মনে আস্থার জায়গাটা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে সর্বাত্মক আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলে দিয়েছেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। দেশের সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে-নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং তার ভোটটা সে দিতে পারে এটি নিশ্চিত করা হবে, এটি আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

নির্বাচনের পূর্ব এবং পরবর্তী থ্রেড অ্যানালাইসিস সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী তার কর্মপন্থায় প্রথম কাজ যেটি করে তা হচ্ছে থ্রেড অ্যাসেসমেন্ট। আমরা অবশ্যই এটি একটি থ্রেড অ্যাসেসমেন্ট করেছি এবং সে অনুযায়ী আমাদের এই মোতায়েন পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা নন-নেথাল ওয়েপন এবং রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট দিয়ে আমাদের বাহিনীকে ইকুইপ করেছি। নির্বাচনকেন্দ্রিক কথা যদি বলি আমরা নির্বাচনকে সামনে রেখে আরও বেশ কিছু রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট সেনাসদস্যদের জন্য নিয়ে এসেছি।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার : নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি অবৈধ অস্ত্র ও প্রায় ২ লাখ ৯১ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দুর্গম এলাকার জন্য হেলিকপ্টার ও নৌযান : দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সামরিক হেলিকপ্টার ও নৌযানের মাধ্যমে কর্মকর্তা ও নির্বাচনি সরঞ্জাম পরিবহন করা হবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগাম হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। 

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে আগের চেয়ে বেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অডিও-ভিডিও ক্যামেরা ও আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। সেনাসদর দফতরে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল কাজ করছে, যা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রাখছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপপ্রচারকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচার ভোটারদের আতঙ্কিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রচারে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

সেনাপ্রধানের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা আশ্বস্ত করেছি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

এফআর


  বিষয়:   নির্বাচন  কঠোর বার্তা  সেনাসদর  সহিংসতা  রোধ  সর্বাত্মক  প্রস্তুতি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: