বিদ্রোহীদের চাপে কোণঠাসা বিএনপি

মেহেরাব হোসেন, শিবচর (মাদারীপুর)

মাদারীপুর-১ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিএনপি। স্থানীয় ভোটার ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

2026-02-06T06:21:04+00:00
2026-02-06T06:21:04+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বিদ্রোহীদের চাপে কোণঠাসা বিএনপি
মাদারীপুর-১ আসন
মেহেরাব হোসেন, শিবচর (মাদারীপুর)
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:২১ এএম 
(বাম থেকে) বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কামাল জামান। ছবি : সংগৃহীত
মাদারীপুর-১ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিএনপি। স্থানীয় ভোটার ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভোটের মাঠে বড় সংকট তৈরি করেছে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে একাধিক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বিএনপির চূড়ান্ত মনোনীত প্রার্থী। 

দল থেকে বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের প্রভাব নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। 

মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপি চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন দিয়েছে নাদিরা আক্তারকে। তবে একই আসনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল প্রতীক) হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। 

অন্যদিকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেলেও তা স্থগিত হওয়ায় শিবচর উপজেলা বিএনপির কার্যকরী সদস্য কামাল জামান মোল্লাও বিদ্রোহী প্রার্থী (জাহাজ প্রতীক) হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে থাকায় উভয় নেতাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক প্রভাব এবং সমর্থকদের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, আমি ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নেই। দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় থেকেছি। অথচ এবার আমাকে কেন মনোনয়ন দেওয়া হলো না তা আজও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। 

অন্য বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল জামান মোল্লা বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম। প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ার পরও তা কেন বাতিল করা হলো সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। জনগণের সমর্থন নিয়েই আমি নির্বাচনে আছি।

বিএনপির স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এতে ভোটের মাঠে নাদিরা আক্তারের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সরেজমিন স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, মাদারীপুর-১ (শিবচর) সংসদীয় আসনে নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নৌকা প্রতীকের পক্ষে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়ায় শিবচরজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তারের সমর্থনে সম্প্রতি শিবচর পৌরসভার খানবাড়ী এলাকায় মরহুম সুলতান খানের বাড়িতে একটি নির্বাচনি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মী উপস্থিত হয়ে বিএনপি প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। উঠান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিবচর পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হেমায়েত হোসেন খান। 

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সোহেল রানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার। বৈঠকে বিএনপির উপজেলা আহ্বায়ক মো. শাহাদাত হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক জহের গোমস্তা, সদস্য আবু জাফর চৌধুরী, পৌর বিএনপির সদস্য সচিব আজমল হোসেন খান সেলিমসহ বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিবচর পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএম আতাহার বেপারি ও ফাহিমা আক্তার, বিভিন্ন ইউনিয়নের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান, পৌরসভার বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী।

 এ সময় উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ ও সাবেক সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে তারা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে চৌধুরী নাদিরা আক্তারকে সমর্থন করছেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেবেন। 

এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলেন, শিবচরের মানুষ একজন ভদ্র, জ্ঞানী ও শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি চায় যার নেতৃত্বে জনগণ নিরাপত্তা পাবে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়ন হবে। সেই বিবেচনায় চৌধুরী নাদিরা আক্তারই সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপির পাশে থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন উঠান বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

সভায় সাবেক পৌর মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান বলেন, দীর্ঘদিন বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমরা নিজ বাড়িতে থাকতে পারিনি। আমাদের নেতার নির্দেশে আজ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নাদিরা আক্তারের সমর্থনে একত্রিত হয়েছি। শিবচরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না। ১২ তারিখ নাদিরা আক্তার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে যাবেন। 

সভায় বক্তব্য প্রদানকালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিএনপি প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সবার আগে বাংলাদেশ। আর আমরা বলছি, সবার আগে শিবচর। প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন নিয়েই বাংলাদেশ গঠিত। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে চলব এবং ঐক্যবদ্ধভাবেই বিএনপিকে বিজয়ী করব। 

তিনি আরও বলেন, আমি নির্বাচিত হলে কারও নামে কোনো মিথ্যা মামলা থাকবে না। নির্বাচনের পর কাউকে অযথা হয়রানি করা হবে না। আমরা সবাই এক ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে শিবচরকে একটি আধুনিক ও উন্নত শিবচর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. শাহাদাত হোসেন খান তার বক্তব্যে বলেন, এখন আমরা ঐক্যবদ্ধ। ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করাই আমাদের লক্ষ্য। সবাই নিজ নিজ এলাকায় ভোটারদের ধানের শীষে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করবেন।

এদিকে মাদারীপুর-১ আসনে নিজ দলের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী হাতপাখা মার্কার সমর্থনে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, শিবচর শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম তালুকদার। তার এই অবস্থান স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি শিবচর বাজার এলাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হুসাইনের নেতৃত্বে আয়োজিত গণসংযোগে হাতপাখা মার্কার পক্ষে প্রচারে অংশ নেন শাহ আলম তালুকদার। 

গণসংযোগ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, শিবচর শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম তালুকদার বলেন, দলের খারাপ অবস্থায় শিবচর থেকে আমাকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা হয়। আমি খেলাফত মজলিসের হয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। কিন্তু নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসে আমাকে না জানিয়ে কেন্দ্র থেকে মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাকে রিকশা মার্কার প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এতে আমার তৃণমূলের কর্মীরা কষ্ট পেয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি কেন্দ্রকে জানিয়ে দিয়েছি, এই নির্বাচনে আমি হাতপাখা মার্কার হয়ে মাঠে কাজ করব। ১২ তারিখের আগ পর্যন্ত আমি রিকশা মার্কার সঙ্গে থাকব না।

এ বিষয়ে হাতপাখা মার্কার প্রার্থী মাওলানা আকরাম হুসাইন বলেন, আমি শিবচরের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছি। এতে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরাই মাদারীপুর-১ আসনে জয়ী হব। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে এদেশের মানুষ শত্রু মনে করে। আমরা জামায়াত থেকে সরে আসায় আমাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। মানুষ আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে ১০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা প্রতীক) থেকে প্রার্থী করা হয়েছে মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাকে।

এফআর



  বিষয়:   মাদারীপুর-১ আসন  বিদ্রোহী  কোণঠাসা  বিএনপি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: