মেহেরপুর জেলায় গত এক সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে মোট সাতটি বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে এমন ঘটনায় জেলাজুড়ে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য মতে, সবশেষ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে জেলার গাংনী উপজেলার একটি বিএনপির অস্থায়ী নির্বাচনি কার্যালয়ের পাশ থেকে দুটি বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার করা হয়।
এর আগে, গত ৩১ জানুয়ারি জেলার মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের বিএনপির একটি নির্বাচনি কার্যালয়ের পাশের ঝোপ থেকে একটি হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা বোমাটি দেখতে পেয়ে মুজিবনগর থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি উদ্ধার করে। একই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে একই উপজেলার দারিয়াপুর কালিতলা এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি অফিসের সামনে লাল কসটেপ মোড়ানো আরেকটি হাতবোমা পড়ে থাকতে দেখেন নেতাকর্মীরা। পরে তারা থানায় খবর দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি উদ্ধার করে নিরাপত্তার জন্য পানিভর্তি বালতিতে করে থানায় নিয়ে যায়।
পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি সকালে গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের সহগোলপুর গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী মোজাম্মেল হকের ছেলে মিঠুনের বাড়ির গেটের সামনে থেকে দুটি হাতবোমা ও চাঁদা দাবির চিরকুট উদ্ধার করেন পুলিশ। একটি মিষ্টির প্যাকেটে লাল টেপ দিয়ে মোড়ানো দুটি হাতবোমা ও একটি চিরকুট রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। চিরকুটে দেড়লাখ টাকা মিষ্টি খাওয়ার জন্য দাবি করে মোবাইল ফোনের নগদ অ্যাপে টাকা পাঠানোর জন্য বলা হয়।
পরবর্তীতে ৪ ফেব্রুয়ারি ফের মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের কদমতলায় আলামিনের বাড়ির সামনে পাকা রাস্তার পাশে ড্রেনের মধ্যে একটি লাল টেপ জড়ানো বস্তু দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে মুজিবনগর থানা পুলিশে খবর দেয় তারা। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বোমা সাদৃশ্য বস্তুটি উদ্ধার করে।
মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুর গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, আগে আমাদের এখানে কোনদিনই নির্বাচনি অফিসের পাশে এমনভাবে বোমা পাওয়া যায়নি। এবার একই দিনে আমাদের এই ইউনিয়নের দুই গ্রামে বিএনপি ও জামায়াতের অফিসের পাশে বোমা পাওয়া গেছে। এছাড়া তিন দিন আগেও গ্রামের একজনের বাড়ির পাশে থেকে বোমা উদ্ধার হওয়ায় এ গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গাংনী উপজেলার আমতৈল গ্রামের কয়েকজন বলেন, আমাদের গ্রামে নদীর পরেই চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা। এই এলাকায় একসময় সন্ত্রাসের রাজত্ব চলত। কিন্তু বহুদিন পর আবার আমাদের এলাকায় বোমা উদ্ধার হওয়ায় ঘটনা ঘটেছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এদিকে, নির্বাচনের এই সময় দায়িত্বরত মোবাইল টিম, সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের টহলের মধ্যেও সন্ত্রাসীদের বোমা রেখে যাওয়া ও চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে মেহেরপুরবাসীকে। বিএনপি ও জামায়াতের অফিসের পাশ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে শুধু হুমকি হিসেবেই নয়, বরং এটি নির্বাচন বানচালেরও চেষ্টা বলে ধারণা করছেন অনেকে।
নির্বাচনি অস্থায়ী অফিসের পাশে বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়ে জানতে চাইলে গাংনী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনি প্রধান এজেন্ট আসাদুজ্জামান বাবলু বলেন, গাংনীতে আইনশৃঙ্খলা খুব একটা খারাপ না। নির্বাচনি পরিবেশ আতঙ্কিত করার জন্য ঐ ইসলামিক দলটা (জামায়াতে ইসলাম) এই কাজগুলো করছে বলে আমার মনে হয়। তবে পুলিশ প্রশাসন আরো একটু গতিশীল হলে নির্বাচন ফেয়ার হবে বলে আশা করি।
অপরদিকে মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনের জামায়াতের প্রার্থীর মুখপাত্র জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে কাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মুহা আলম হুসাইন বলেন, আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, আমরা কোনো সন্ত্রাসী বা বে-আইনি কাজের জড়িত না। দাঁড়িপাল্লার গণজোয়ার দেখে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গাংনী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দাস সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি এসব ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোপূর্বে যে দুটি বোমা সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার হয়েছিল, সে মামলায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করছে।
মেহেরপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. জামিনুর রহমান খান সময়ের আলোকে বলেন, বোমা উদ্ধারের বিষয়টি আমাদের তদন্তনাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আপনাদের বিস্তারিত জানানো হবে।
এফআর