৯ আসনে অগ্নিপরীক্ষায় শীষহীন বিএনপি

সাব্বির আহমেদ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের (একটি স্থগিত) মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯টি আসনে বিএনপির দলীয় প্রতীক নেই। অর্থাৎ ৯ আসনের ব্যালটে

2026-02-08T02:52:00+00:00
2026-02-08T02:52:00+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
৯ আসনে অগ্নিপরীক্ষায় শীষহীন বিএনপি
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:৫২ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের (একটি স্থগিত) মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯টি আসনে বিএনপির দলীয় প্রতীক নেই। অর্থাৎ ৯ আসনের ব্যালটে দেখা যাবে না ধানের শীষ। কোথাও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং কোথাও আইনি জটিলতার ফলেই তৈরি হয়েছে এ পরিস্থিতির। 

এ ৮ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয় নিয়ে বেশ শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ভোটের মাঠে প্রার্থীরা পড়ছেন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তাদের সমানে মাঠে লড়াইয়ে আছেন বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন জায়গায় তাদের সঙ্গে মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। 

উত্তাপ ছড়িয়ে ধানের শীষবিহীন এ আসনগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এসব আসনের ভোটাররা মনে করেন, মানুষ মূলত মার্কা দেখে ভোট দেয়। ধানের শীষ মার্কার কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সুবিধা পাবেন।

যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে আসন সমঝোতার অংশ হিসেবেই ৮টি আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। ফলে ওইসব আসনে বিএনপির প্রার্থী নেই, থাকছে না ধানের শীষও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি আসন, যেখানে আদালতের রায়ে চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন। 

হিসাব অনুযায়ী ৩০০ আসনের সংসদে পাঁচটি মিত্র দলকে মোট ৮টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তবে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচনি কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে মোট ২৯৯টি আসেন। 

বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারটি আসন পেয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। বাকি চারটি আসন ভাগ করে নিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি এবং গণঅধিকার পরিষদ। এসব আসনে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রার্থীরা তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এবার খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে চারটি আসনে লড়ছে। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনে দলের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি লড়ছেন মাথাল প্রতীক নিয়ে। ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রয়েছেন কোদাল প্রতীকে। পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ট্রাক প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ লড়ছেন গরুর গাড়ি প্রতীকে।

এ আট আসনের বাইরে কুমিল্লা-৪ আসনে একেবারে ভিন্ন কারণে ব্যালট থেকে বাদ পড়েছে ধানের শীষ। ঋণখেলাপির অভিযোগে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র আদালত চূড়ান্তভাবে বাতিল করেছে। এতে ওই আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীই থাকছেন না।

ফলে সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে ৯টি আসনের ব্যালটে অনুপস্থিত থাকছে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ। তবে ভোটের ময়দানে ধানের শীষ না থাকলেও এসব আসনের প্রায় সব কটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ছেন। যদিও এরই মধ্যে তাদের সবাইকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

আর হাইকোর্টের আদেশের পর প্রচারে মধ্যভাগে এসে ধানের শীষ প্রতীক পান কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। প্রথমে বিএনপি মনোনয়ন দেয় সাবেক এমপি আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে। কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার কারণে তার মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন বাতিল করে। আদালতও অবৈধ ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত এই আসনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি।

সবার চোখ তিন সাইফুলের ঢাকা-১২ : রাজধানীর মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকার ছয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন। এ আসনটি বিএনপি জোটের শরিক দলকে ছেড়ে দেওয়ায় এখানে নেই ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। তবে বিএনপির সমর্থন নিয়ে এ আসনে কোদাল প্রতীকে লড়ছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী সাইফুল হক। এখানে স্বতন্ত্র হিসেবে আছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব। 

এই দুজনের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, লড়াই হবে মূলত জামায়াত, বিএনপির বিদ্রোহী ও বিএনপি-সমর্থিত জোট প্রার্থীর মধ্যে। দল থেকে বহিষ্কার হয়েও ভোটের মাঠ ছাড়েননি ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব। স্বতন্ত্র হিসেবে ফুটবল মার্কা নিয়ে তিনি লড়াই করছেন জোরেশোরে। প্রচারে মাঠে বিএনপির একটি অংশ সাইফুল হকের সঙ্গে থাকলেও বড় একটি অংশ নীরবে আছে নীরবের সঙ্গে।

কোদাল মার্কার প্রার্থী সাইফুল অভিযোগ করেন, তার প্রচার মাইক ভাঙা হয়েছে। তাদের কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। কিন্তু এসব করে বিজয় ঠেকানো যাবে না। ইনশাআল্লাহ কোদাল মার্কার বিজয় সুনিশ্চিত হবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন সাইফুল হক। এখানে জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের দাঁড়িপাল্লা রয়েছে শক্ত অবস্থানে। 

এ আসনের ভোটার তেজগাঁওয়ের বেসরকারি চাকুরে আল মিনার বলেন, ভোটের মাঠে মার্কা একটা বড় ফ্যাক্টর। ধানের শীষ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। কোদালকে বিএনপি সমর্থন দিলেও এত পরিচিত মার্কা নয় এটি। এ কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নীরব এগিয়ে থাকবেন। আবার এদের কোদাল-ফুটবলের ধাক্কাধাক্কিতে দাঁড়িপাল্লাও বেরিয়ে যেতে পারে। কারণ দাঁড়িপাল্লার ভোট কাটাকাটি হবে না। বলা যায়, কোদাল-ফুটবলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে দাঁড়িপাল্লা।

রুমিন ফারহানায় জমে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ : সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসেন দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির আলোচিত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তাকে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীবের (খেজুর গাছ) সঙ্গে ভোটের মাঠে শক্ত লড়াই গড়ে তুলেছেন রুমিন ফারহানা। প্রচারের মাঠে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ। জানা গেছে, রুমিন ফারহানার সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ মাঠে রয়েছেন। আর আলোচিত ধর্মীয় বক্তা জুনায়েদ আল হাবীবের সঙ্গে রয়েছেন কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। ওই আসনে এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকজন পরিচিত প্রার্থী আছেন ভোটের মাঠে।

ট্রাক আর ঘোড়ায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই : পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর (ট্রাক)। তাকে বিএনপি জোটগতভাবে মনোনয়ন দিয়েছে। 

তবে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। এ আসনে ভোটের লড়াই জমে উঠেছে। নুর ও মামুনের কথার লড়াই এখন সংঘাতে রূপ নিয়েছে। তাদের সমর্থকদের দেখে উসকানিমূলক স্লোগান থেকে শুরু করে কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। বিএনপি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুর এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাসান মামুনের কর্মী-সমর্থকরা সংঘর্ষ জড়িয়েছে কয়েকবার।

হাসনাতকে হারাতে ট্রাকে ভর করেছে বিএনপি : আর কুমিল্লা-৪ আসনে ধানের শীষ হারানো বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নেমেছেন। বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির মনোনয়ন অবৈধ হওয়ার পরপরই বিএনপি স্থানীয় নেতাকর্মীদের ট্রাক প্রতীকে প্রার্থী জসিম উদ্দিনের পক্ষে মাঠে নামার নির্দেশ দেয়। 

তারই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার সকাল থেকে তারা ট্রাক প্রতীকের পক্ষে প্রচার শুরু করেন। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপি দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। এখন এখানে ট্রাক প্রতীকে প্রার্থীই তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে সাধারণ ভোটারদের ধারণা।

খেজুর গাছের সামনে ‘চাকসু মামুন’ : সিলেট-৫ আসনে (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) বিএনপি সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে (খেজুর গাছ)। তবে তার সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশিদ। যিনি ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিত। এই আসন ঘিরে নির্বাচনি মাঠে তৈরি হয়েছে জটিল ও উত্তপ্ত সমীকরণ। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে মাওলানা ফারুকের জন্য। চাকসু মামুনের প্রার্থিতাই এখন জমিয়ত প্রার্থীকে বড় চাপের মধ্যে ফেলেছে।

স্বাধীনতার পর এ আসনে আওয়ামী লীগ চারবার, জাতীয় পার্টি তিনবার এবং বিএনপি, খেলাফত মজলিশ ও জামায়াতে ইসলামী একবার করে জয়ী হয়েছে। সবশেষ নির্বাচনে জয় হন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে ফুলতলী ঘরানার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের অনুসারীদের ভোট কোন দিকে যাবে; তা নিয়েই এখন মূল কৌতূহল। ফুলতলী ঘরানা হলো সিলেট অঞ্চলের সুন্নি, হানাফি ও সুফি ঘরানার (মসলক) আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ধারা হিসেবে সুপরিচিত।

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   অগ্নিপরীক্ষা  শীষহীন  বিএনপি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: